প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজ্যে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা নজিরবিহীন ডামাডোলের আবহেই এবার সরাসরি বিধানসভা ভবনে পৌঁছে গেল রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (CID)। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা (LOP) নির্বাচন-সংক্রান্ত তৃণমূলেরই একাধিক বিধায়কের সই জাল করার অভিযোগের তদন্তে আজ, সোমবার (১৫ জুন ২০২৬) বিকেলে সিআইডি-র একটি বিশেষ দল বিধানসভায় প্রবেশ করে। তদন্তকারী আধিকারিকরা বিধানসভার সচিব এবং অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর সঙ্গে কথা বলছেন বলে সূত্রের খবর। মূল ‘রেজলিউশন বুক’ বা বিধায়কদের সই করা আসল খাতার খোঁজেই সিআইডি-র এই আকস্মিক হানা বলে মনে করা হচ্ছে। গতকালই (১৪ জুন) এই হাই-প্রোফাইল মামলায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিধায়ক কুণাল ঘোষকে ভবানী ভবনে মুখোমুখি বসিয়ে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা ম্যারাথন জেরা করেছিলেন গোয়েন্দারা। তার ঠিক পরের দিনই তদন্তকারীদের বিধানসভায় পা রাখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গত মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই দলীয় স্তরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। গত ১৯ মে বিধানসভার সচিবালয়ে একটি প্রস্তাব বা রেজলিউশন কপি জমা দেওয়া হয়, যেখানে বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা (LOP) হিসেবে মনোনীত করার জন্য ৭০ জন তৃণমূল বিধায়কের সই ছিল।বিতর্কের সূত্রপাত হয় ২৫ মে, যখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা সহ দলের একাধিক বিধায়ক অভিযোগ করেন যে, ৬ মে-র দলীয় বৈঠকে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নাম ও সই জোর করে ওই তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি কিছু বিধায়কের নাম সইয়ের জায়গায় ইংরেজির ‘ক্যাপিটাল লেটারে’ (বড় হাতের অক্ষরে) লেখা ছিল, যা তীব্র সন্দেহের জন্ম দেয়। বিধায়কদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি শেষ পর্যন্ত সিআইডি-র বিশেষ তদন্তকারী দলের (SIT) হাতে যায়। সিআইডি সূত্রে খবর, এই জালিয়াতির সত্যতা প্রমাণে আসল রেজলিউশন বুকটি (যেখানে বিধায়করা সই করেছিলেন) হাতে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। এর আগে গত ৯ জুন সিআইডির প্রায় ৩০ জনের একটি দল কালীঘাটে তৃণমূলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় (৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট) এবং ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসেও তল্লাশি চালিয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গোয়েন্দাদের জানিয়েছিলেন যে বিধায়কদের সই কালীঘাটের দলীয় কার্যালয়েই সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও আসল খাতাটি না মেলায় এবার সরাসরি বিধানসভা সচিবালয়ের দ্বারস্থ হলেন গোয়েন্দারা, যাতে মূল নথির সঙ্গে বিধায়কদের আসল সই মিলিয়ে দেখা যায়।
এই মামলাটি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের নজরে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) হাইকোর্ট অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিআইডি তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিলেও, আগামী ২১ দিনের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনো জোরপূর্বক আইনি পদক্ষেপ (যেমন গ্রেফতারি) না করার অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সিআইডি-কে যেকোনো জায়গায় তল্লাশি চালানোর পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর তৃণমূলের বিধায়কদের একাংশ বকলমে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। বিক্ষুব্ধ বিধায়ক সন্দীপন সাহা ইতিমধ্যেই দাবি করেছেন যে তাঁর পিছনে ৬৪ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। এই চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মাঝেই বিধায়কদের সই জাল করার মতো গুরুতর অপরাধে সিআইডি-র বিধানসভায় প্রবেশ ঘাসফুল শিবিরের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিল। বিধানসভার সচিবের ঘর থেকে সিআইডি কী কী নথি সংগ্রহ করে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
