প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ক্ষমতার দম্ভ, সীমাহীন অহংকার আর বিরোধী শূন্য করার চক্রান্ত—সবকিছুই যে এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ বোধহয় দেখছে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তথা তৃণমূলের চরম দেউলিয়াপনার পর, এবার সরাসরি আইনি কোপে পড়লেন বিদায়ী শাসক শিবিরের ‘সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের প্রচার পর্বে প্রকাশ্য জনসভা থেকে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী এবং ভোটারদের উদ্দেশ্য করে চরম উসকানিমূলক মন্তব্য এবং কুৎসিত হুমকির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের হলো বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে।রাজনৈতিক মহলের মতে, এতদিন ধরে বাংলায় যে স্বৈরাচারী ও ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করে রাখা হয়েছিল, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহে তা আজ ধূলিসাৎ। আর সেই ভয়ের খাঁচা ভাঙতেই এবার সাধারণ নাগরিকরা বুক চিতিয়ে তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন।
অভিযোগপত্রের বিবরণী অনুযায়ী, গত ২৭ এপ্রিল একটি নির্বাচনী জনসভা থেকে চরম দম্ভ প্রকাশ করেছিলেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি কর্মীদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত কুরুচিকর মেজাজে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, “৪ তারিখ বারোটার পরে কোন জল্লাদের কত ক্ষমতা আর কার দিল্লির বাবা কাকে বাঁচাতে আসে আমি ৪ তারিখ দেখব।” তৃণমূলের রাজত্বে পুলিশ-প্রশাসনকে পকেটে পুরে বিরোধীদের যেভাবে ‘উদারতা’র খোঁটা দেওয়া হতো এবং খুনের রাজনীতির হুমকি দেওয়া হতো, অভিষেকের এই বয়ান তারই এক চূড়ান্ত নজির ছিল। বাগুইআটি এলাকার এক সাহসী বাসিন্দা এবার এই প্রকাশ্য মাস্তানি ও প্ররোচনার বিরুদ্ধে বিধাননগরে লিখিত অভিযোগ ঠুকে দিয়েছেন, যার জেরে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক পুলিশি তদন্ত।
বিজেপি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাফ কথা, তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ভিত্তিটাই গড়ে উঠেছিল কয়লা পাচার, গরু পাচার, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি আর বালি চুরির মতো হাজারো দুর্নীতির পাহাড়ের ওপর। তার ওপর যোগ হয়েছিল সন্দেশখালি থেকে শুরু করে রাজ্যের কোণায় কোণায় নারীদের ওপর অত্যাচার ও সাধারণ মানুষের ওপর ‘তোলবাজি’র রাজত্ব।ক্ষমতার অন্ধ অহংকারে বুঁদ হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পিসি ভেবেছিলেন, সরকারি অর্থ আর পেশীশক্তির আস্ফালনে আজীবন বাংলার মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফলে বাংলার জাগ্রত জনতা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ‘চাটুকার’ পরিবেষ্টিত এই স্বৈরাচারী রাজত্বের পতন অনিবার্য ছিল। আজ চারপাশ থেকে যখন জনরোষ আছড়ে পড়ছে, তখন তাঁদের নিজেদের দলের নেতারাই এখন প্রকাশ্যেই অভিষেকের কুৎসিত একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
সময় বদলাতেই এখন ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছে। যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এতদিন কয়েকশো বুলেটপ্রুফ গাড়ি এবং বিশাল পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে বিরোধীদের দিকে আঙুল তুলতেন, রাজ্যের নতুন সরকার গঠিত হতেই তাঁর সেই অতিরিক্ত ভিভিআইপি (VVIP) সুরক্ষা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আজ তিনি স্রেফ একজন সাধারণ সাংসদ, যাঁর মাথার ওপর থেকে প্রশাসনের ‘রক্ষাকবচ’ সরে গিয়েছে। বিধাননগর সিটি পুলিশ এই এফআইআর-এর ভিত্তিতে কঠোর আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, এতদিন ধরে বিরোধীদের কেস দিয়ে জেলে পোরা কিংবা গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানোর যে নোংরা খেলা তৃণমূল খেলে এসেছে, এবার আইনের সেই একই চাবুক নিজেদের পিঠে পড়ার ভয়ে থরথর করে কাঁপছে গোটা ক্যামাক স্ট্রিট। ‘দিল্লির বাবা’ কেউ আসবে কি না জানা নেই, তবে বাংলার মাটিতে অধর্মের বিনাশ ঘটিয়ে আইনের শাসন যে ফিরছে, অভিষেকের বিরুদ্ধে এই এফআইআর তারই এক মহাসংকেত।
