প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ এক নজিরবিহীন মোড় নিয়েছে। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে দলটির ২০ জনেরও বেশি সাংসদ লোকসভায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসক জোট এনডিএ (NDA)-কে সমর্থন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছেন। দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনি জটিলতা এড়াতে এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীটি ত্রিপুরা-ভিত্তিক ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র সাথে নিজেদের একীভূত করে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়েছে। এই নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাকলি ঘোষ দস্তিদার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান, “NDA-এর সঙ্গেই আমরা কাজ করব। রাজ্যে কেন্দ্রীয় প্রকল্প কার্যকরের জন্য পদক্ষেপ করব।” শুনতে ভারী চমৎকার এবং জনকল্যাণমুখী মনে হলেও, এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ও তীক্ষ্ণ কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই মন্তব্য এবং এনডিএ জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ স্রেফ ‘সুযোগসন্ধানী রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। ক্ষমতা গেলে তবেই কি মোদীজির নেতৃত্ব ভালো লাগে? রাজ্যে ক্ষমতায় থাকাকালীন যে তৃণমূল নেতারা কেন্দ্রের প্রতিটি নীতি এবং মোদী-শাহ জুটির তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন, আজ রাজ্যে ক্ষমতা হারাতেই তাঁদের মুখে কেন্দ্রের এনডিএ সরকারের প্রশংসা শোনা যাচ্ছে। এটা কি আসলেই মোদীজির নীতির প্রতি ভালোবাসা, নাকি স্রেফ নিজেদের সাংসদ পদ এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচানোর শেষ মরিয়া চেষ্টা? কাকলিদেবী বলছেন, রাজ্যে কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি কার্যকর করতে তাঁরা পদক্ষেপ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন রাজ্যের মানুষ আয়ুষ্মান ভারত বা পিএম আবাস যোজনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন, তখন কেন লোকসভায় দাঁড়িয়ে এই সাংসদেরা নিজের দলের সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি? যদি সত্যিই তৃণমূলের নীতি (দুর্নীতির) বিরুদ্ধে এঁদের প্রতিবাদ থাকত, তবে নৈতিকতার খাতিরে সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে নতুন করে মানুষের রায়ের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখালেন না কেন? দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশের অঙ্ক মিলিয়ে অন্য দলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করার এই চাতুর্য কি জনস্বার্থে, নাকি নিজেদের আখের গোছাতে?
আমরা স্পষ্টভাষী এবং সত্যের পক্ষে। তাই বিজেপি তথা এনডিএ শিবিরের অন্ধ স্তাবকতা করা আমাদের কাজ নয়। দল হিসেবে আজ বিজেপিরও গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করার সময় এসেছে। বাংলার মানুষ তৃণমূলের অপশাসন, তোলাবাজি আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়েই বিকল্প হিসেবে বিজেপিকে ম্যান্ডেট দিয়েছে। এখন যদি সেই বিদায়ী অপশাসনের প্রথম সারির কারিগরদেরই এনডিএ-র শরিক বানিয়ে লাল কার্পেট বিছিয়ে স্বাগত জানানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে কী বার্তা যাবে? সাধারণ বিজেপি কর্মীরা, যারা বছরের পর বছর মার খেয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন, তাঁরা এই সুবিধাবাদী দলবদলুদের কোন চোখে দেখবেন? কাকলিদেবী আজ নারী নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আর চাইল্ড ট্রাফিকিং নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। খুব ভালো কথা! কিন্তু গত এক দশকে বাংলায় যখন নারীদের ওপর একের পর এক নির্যাতন হয়েছে, তখন কেন ক্ষমতার চশমা চোখে এঁটে তিনি নীরব দর্শক সেজে বসেছিলেন? এতদিন সর্ষের মধ্যেই ভূত হয়ে বসেছিলেন, আর আজ ক্ষমতার অলিন্দ বদলাতেই সাধু সাজার চেষ্টা করছেন!
রাজনীতিতে সংখ্যার খেলা বা সমীকরণ থাকবেই, কিন্তু তা যেন নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে না হয়। এনডিএ নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে, সুবিধাবাদীরা সুসময়ের বন্ধু হয়, অসময়ের নয়। আজ যারা নিজেদের আদি দলকে ডুবতে দেখে জাহাজ ছেড়ে পালাচ্ছে, কাল যদি ক্ষমতার হাওয়া সামান্য অন্য দিকে ঘোরে, তবে তারা এনডিএ-কেও মাঝদরিয়ায় ফেলে পালাতে দু’বার ভাববে না। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই আকস্মিক ভোলবদলকে বাংলার সচেতন মানুষ কিন্তু খুব ভালো চোখে দেখছে না। বাংলার মানুষ সব দেখছে এবং সঠিক সময়ে এর হিসাব বুঝিয়ে দেবে।
