প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু হয় না—এই বহু পুরোনো প্রবাদটিই যেন ২০২৬ সালে এসে অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হলো পশ্চিমবঙ্গের বুকে। ভারতের নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং ঐতিহ্যবাহী ‘ঘাসফুল’ প্রতীক ফ্রিজ (স্থগিত) করার পর রাজ্য রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব ধস নেমেছে, তার জল এখন বহু দূর গড়িয়েছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একসময়ের চেনা শত্রু, জাতীয় কংগ্রেসের শরণাপন্ন হতে হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর দল ঘোষণা করেছে, নন্দীগ্রামে তারা কংগ্রেস প্রার্থীকেই পূর্ণ সমর্থন দেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে দেখছেন এক চরম মহাজাগতিক পরিহাস হিসেবে। কারণ, যে কংগ্রেসকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার পণ নিয়ে ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন, আজ নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় সেই কংগ্রেসেরই ‘হাত’ ধরতে বাধ্য হলেন তিনি।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৎকালীন সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) গঠন করেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্যই ছিল বাংলায় কংগ্রেসকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া। তাঁর অভিযোগ ছিল, দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্ব বাংলার তৎকালীন শাসকদল বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে নরম মনোভাব দেখাচ্ছে। পরবর্তী আড়াই দশকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় কংগ্রেসের ভিত প্রায় সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলেন। মালদহ, মুর্শিদাবাদ বা উত্তর দিনাজপুরের মত কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী শক্ত ঘাঁটিগুলি একে একে দখল করে নেয় তৃণমূল। গত এক দশকে বারবার মমতার মুখে শোনা গিয়েছে, “কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া মানে বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়া”। এমনকি ২০২৪-এর লোকসভা বা ২০২৬-এর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও বাংলায় কংগ্রেসকে বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক জমি ছাড়েননি তিনি। কিন্তু ক্ষমতার চাকা ঘুরতেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গেল।
তৃণমূলের অন্দরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে দল আজ দুটি শিবিরে বিভক্ত। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা, অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এই অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের জেরে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন দলের নাম ও প্রতীকই ফ্রিজ করে দিতে বাধ্য হয়। বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তৃণমূলের একাধিক শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে পুরোনো দুর্নীতি মামলার গতি বেড়েছে। দলের সিংহভাগ বড় নেতা হয় নিষ্ক্রিয়, নয়তো দলছুট। ফলে যে সাংগঠনিক শক্তির দাপটে তৃণমূল চলত, তা আজ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। নন্দীগ্রাম একসময় মমতার আন্দোলনের ধাত্রীভূমি ছিল। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে হারের পর, এই উপনির্বাচনেও প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়া মমতার শিবিরের সাংগঠনিক দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে দিয়েছেন। এই চরম কোণঠাসা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই কংগ্রেসের হাত ধরা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে রাহুল গান্ধী এবং কে সি বেণুগোপাল দিল্লির রাজনীতিতে মমতার পাশে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে ‘গণতন্ত্রের কালো দিন’ বলে তীব্র নিন্দা করেছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, কংগ্রেস এখন পশ্চিমবঙ্গে হারিয়ে যাওয়া জমি ফিরে পাওয়ার বড় সুযোগ দেখছে। যে দলটিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শূন্যে নামিয়ে এনেছিলেন, আজ সেই দলের প্রার্থীর জয়ের জন্য মমতা অনুগামীদের খাটতে হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো রণকৌশলগত জোট নয়, বরং এটি পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া এক নেত্রীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা। যে কংগ্রেসকে শেষ করার ব্রত নিয়ে দল গড়েছিলেন, আজ সেই দলটির অস্তিত্বের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে তাঁকে। একেই বলে রাজনীতির অমোঘ নিয়তি।
