প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আইনি টানাপোড়েনের মাঝেই এবার তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ঘিরে সামনে এল এক বিস্ফোরক তথ্য। বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার সেলের তদন্তে জানা গেছে, ‘ডেবিট ফ্রিজ’ বা টাকা তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দলের ৩টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বড় অঙ্কের অর্থ জমা (Inward Transactions) পড়েছে। এই তথ্য সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে চরম শোরগোল পড়ে গেছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, কলকাতার শরৎ বোস রোডের একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের (HDFC Bank) শাখায় তৃণমূল কংগ্রেসের ওই ৩টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা গচ্ছিত আছে। জয়নগরের এক তৃণমূল বিধায়ক এবং বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতাদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানা এই অ্যাকাউন্টগুলির ওপর ‘ডেবিট ফ্রিজ’ জারি করেছিল। বর্তমানে সাইবার সেলের গোয়েন্দারা এই অ্যাকাউন্টগুলির গত ৫ বছরের সমস্ত লেনদেনের খতিয়ান ও ডিজিটাল লগ পরীক্ষা করছেন। তদন্তকারীদের দাবি, টাকা তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অ্যাকাউন্টগুলিতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দফায় দফায় মোটা অঙ্কের টাকা জমা পড়ার প্রক্রিয়া জারি ছিল, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক। এই অ্যাকাউন্টগুলি কবে, কোন কেওয়াইসি (KYC) নথির ভিত্তিতে খোলা হয়েছিল এবং কারা এর অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী (Authorized Signatories) ছিলেন, তার সমস্ত বিবরণ ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তলব করেছে পুলিশ।
এই আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগটি মূলত তৃণমূলের অন্দরের তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ফসল। বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী শিবিরের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই তুঙ্গে ওঠে। ১০ জন বিদ্রোহী বিধায়ক পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন যে, তোলাবাজি ও ‘কাটমানি’র বিপুল বেআইনি টাকা এই অ্যাকাউন্টে লুকানো রয়েছে। এর আগেই অবশ্য দলের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস ব্যাঙ্ককে চিঠি দিয়ে লেনদেন বন্ধের আর্জি জানিয়েছিলেন। এর জেরে অরূপ বিশ্বাসকে শোকজ করে মূল তৃণমূল নেতৃত্ব। মুখপাত্র কুণাল ঘোষ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, “এই অ্যাকাউন্ট যদি বেআইনি হয়, তবে বিক্ষুব্ধ বিধায়কেরা এই ফান্ডের টাকা নিয়ে কীভাবে নির্বাচন লড়লেন এবং জিতলেন?” অন্যদিকে সাংসদ মহুয়া মৈত্রও বিক্ষুব্ধদের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন।
এদিকে এই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে তৃণমূলের মূল নেতৃত্ব। দলের দৈনন্দিন কাজকর্ম ও সাংগঠনিক খরচ চালাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) দ্বারস্থ হয়েছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। আদালতে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কোনো আদালতের নির্দেশ ছাড়া পুলিশ কীভাবে একটি রাজনৈতিক দলের অডিটেড এবং বৈধ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশ দিতে পারে?
আইনি লড়াইয়ের সমান্তরালে সাইবার সেলের এই নতুন দাবি যে ঘাসফুল শিবিরের ওপর চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল, তা বলাই বাহুল্য। অ্যাকাউন্টগুলির অর্থের উৎস এবং ডেবিট ফ্রিজ থাকার পরেও এই রহস্যময় লেনদেনের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা জানতে ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে পুলিশ।
