প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ক্ষমতার হাতবদল যে কত দ্রুত একটা রাজনৈতিক দলের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ ২০২৬-এর এই তপ্ত জুন মাস। মে মাসে বাংলার মসনদ হারানোর ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি কালীঘাট, তার মধ্যেই নজিরবিহীন মহানাটক খোদ বিধানসভার অন্দরে! যে দল কদিন আগেও রাজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, আজ বিরোধী আসনে বসেই তাদের ৫৮ জন বিধায়ক খাতা-কলমে সই করে জানিয়ে দিলেন— “পিসি-ভাইপোর প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি আর চালানো যাচ্ছে না!” রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর এবার দেশের সংসদেও কি তবে চূড়ান্ত বিসর্জনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল? দিল্লির সাউথ ব্লক থেকে কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দ— সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন: ৪১-এর সংসারে ১২ জন সাংসদের সম্ভাব্য বিদ্রোহে দিল্লির তাসের ঘর কি এবার ধূলিসাৎ হতে চলেছে?
বর্তমানে সংসদে দলটির মোট ৪১ জন সাংসদ রয়েছেন (লোকসভায় ২৮ এবং রাজ্যসভায় ১৩)। দিল্লির রাজনৈতিক সূত্রের খবর, বিধানসভার এই ঐতিহাসিক বিদ্রোহের পর অন্তত ১২ জন সাংসদ ইতিমধ্যেই বিকল্প সমীকরণের খোঁজে দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে তীব্র জল্পনা। আরও ৮ জন সাংসদ নাকি স্রেফ সময়ের অপেক্ষায়। তবে আইনত দলত্যাগ বিরোধী খাঁড়া এড়াতে গেলে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ অন্তত ২৭-২৮ জন সাংসদকে এককাট্টা হতে হবে। তাঁরা কি শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো ‘সংসদীয় গোষ্ঠী’র আত্মপ্রকাশ ঘটাবেন? দেওয়াল লিখন বলছে, জল্পনার ধোঁয়া কিন্তু বেশ ঘন! বিধানসভায় দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেভাবে ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের নেতা তথা নতুন বিরোধী দলনেতা (LoP) হিসেবে বেছে নিলেন, তা এক নজিরবিহীন ঘটনা। আর এই বিদ্রোহের মূল তির কিন্তু দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, লোকসভা ও রাজ্যসভার প্রবীণ সাংসদদের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে এই ‘একনায়কতন্ত্র’ ও ‘ভাইপো-সংস্কৃতি’র ওপর বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর, নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতেই এখন বহু সাংসদ দিল্লির ছত্রছায়ায় আসার পথ খুঁজছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে এতদিন এই দলের মূল শক্তি বা ‘ইউএসপি’ (USP) কী ছিল? লোকসভা এবং রাজ্যসভায় তাদের সাংসদ সংখ্যার দাপট, যার জোরে দিল্লির বিরোধী জোটে তারা ছড়ি ঘোরাতেন। কিন্তু যদি সংসদের এই ৪১ জনের দলটাই শেষ পর্যন্ত ভেঙে দু-টুকরো হয়ে যায়, তবে জাতীয় স্তরে দলটির প্রাসঙ্গিকতা এক লহমায় তলানিতে এসে ঠেকবে। আঞ্চলিক পরাশক্তি থেকে তারা স্রেফ একটি প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হবে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি রাজ্য ও বুথ স্তরের সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি একযোগে ভেঙে দিয়ে ‘আমূল সংস্কার’এর কথা ঘোষণা করেছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা আসলে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ঘরে যখন আগুন লেগে যায়, তখন দরজা বন্ধ করে রাখলে শুধু ধোঁয়াই বাড়ে, আগুন নেভে না। রাজ্য হাতছাড়া হওয়ার পর এবার দিল্লির সংসদীয় দল বাঁচানোই এখন কালীঘাটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
