প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে নাকি শেষ কথা বলে কিছু হয় না! কিন্তু একটা আস্ত রাজনৈতিক দলকে যদি কর্পোরেট কর্পোরেশনের মতো চালানো হয়, তবে ক্ষমতার অলিন্দ থেকে সরার পর তার পরিণতি ঠিক কী হতে পারে— আজ বোধহয় সেটাই প্রকাশ্য দিবালোকে, ক্যামেরার সামনে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যে দল একসময় সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে মহাকরণের দখল নিয়েছিল, আজ সেই দলেরই অন্দরের আদিম কঙ্কালগুলো যেভাবে রাজপথে বেরিয়ে আসছে, তা দেখে তাজ্জব বনে যাচ্ছে রাজনৈতিক মহল। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সদ্য বহিষ্কৃত হওয়ার পর আজ বিধানসভার চত্বরে দাঁড়িয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-কে এক হাত নিলেন, তা এককথায় নজিরবিহীন! বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র শ্লেষে বিঁধে তিনি যে প্রশ্নগুলো তুললেন, তা সাবেক শাসক শিবিরের অভ্যন্তরীণ সংকটের কথাই জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ।
আজ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নাম না করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে যেভাবে তীব্র আক্রমণের তির ছুঁড়লেন, তা একপ্রকার বেনজির। বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ভোট বিপর্যয়ের ২৬ দিন পর বাইরে বেরিয়ে যিনি চোরপিটুনি বা গণপিটুনি খেলেন, তিনি বলেছিলেন জনগণই তাঁকে নিরাপত্তা দেবে। তবে এত বড় জননেতা হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে?” ঋতব্রত বাবু বুক ফুলিয়ে দাবি করেন, তিনি নিজে কোনো অতিরিক্ত নিরাপত্তা ছাড়াই সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং তাঁকে কোথাও ‘চোর চোর’ স্লোগান শুনতে হচ্ছে না। ভাবুন একবার! একজন বিধায়ক, যিনি নিজে কোনো অতিরিক্ত নিরাপত্তা ছাড়াই সাধারণ মানুষের মধ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তিনি প্রশ্ন তুলছেন তাঁরই দলের শীর্ষ নেতার তথাকথিত ‘জনপ্রিয়তা’ আর ‘নিরাপত্তা’ নিয়ে! রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ঋতব্রতের এই মন্তব্যের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যে দল আজ বহিরাগত এজেন্সির হাতে বন্দি হয়ে ধ্বংসের মুখে পড়েছে, সেটাই তিনি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন। তবে এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব প্রশাসনের, কারণ অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের এই খেলায় আসল সত্য আড়ালে চলে যায় বলেই সাধারণ মানুষের ধারণা।
এখানেই শেষ নয়, আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভার ক্ষেত্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো আইনগত বা সাংগঠনিক এক্তিয়ার নেই, তিনি সেখানে ‘কেউ নন’। দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র যে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এবং একনায়কতন্ত্রই যে দলটিকে ডোবাল, বহিষ্কৃত বিধায়কের এই মন্তব্যে তা আরও একবার প্রকাশ্য রাস্তায় চলে এল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তবে দলবিরোধী কাজের জন্য বহিষ্কৃত নেতার এই ধরণের ক্ষোভকে সাবেক শাসক শিবিরের একাংশ ‘হতাশাজনক প্রলাপ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণই নয়, পুরো দলটাই এখন আইপ্যাক নামের একটা এজেন্সির ইশারায় চলছে বলে মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, উলুবেড়িয়া পুরসভার দুর্নীতি ও সাংগঠনিক নানা ত্রুটি নিয়ে তিনি আগেই এজেন্সিকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ভোটের দিন প্রশাসনের কাছে একরকম সই জমা পড়েছে এবং পোল-প্যাকেটে অন্য সই পাওয়া গেছে বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। বহু জায়গায় পোলিং এজেন্টদের বসতে দেওয়া হয়নি বলেও তাঁর দাবি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটা রাজনৈতিক দল কি সত্যিই কোনো এজেন্সির অঙ্গুলিহেলনে চলতে পারে? নাকি দল ক্ষমতার অলিন্দ থেকে চ্যুত হতেই এবার অন্দরমহলের কঙ্কালগুলো একে একে বাইরে বেরিয়ে আসছে? প্রশ্নটা কিন্তু উঠছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে তৃণমূল এখন আর ক্ষমতায় নেই। আর এই পরিবর্তনের আবহে এই ধরণের বিস্ফোরক অভিযোগ আগামী দিনে দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্বকে আরও বড় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। জল কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
