প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-শহিদের রক্তের বিনিময়ে বাংলার সাধারণ মানুষ কী পেল, আর কারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিলেন—এত বছর পর বিধানসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই চাঞ্চল্যকর ফাইল টেনে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই তিনি ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের পুলিশি অবিচারের সত্য অনুসন্ধানে গঠিত সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের প্রায় ৭০০ পাতার তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে পেশ করেন। আর সেই সরকারি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই মুখ্যমন্ত্রী আজ যে ঝাঁঝালো বক্তব্য রাখলেন, তাতে রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী এদিন তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, ২১ জুলাইয়ের সেই আবেগ ও শহিদ দিবসকে হাতিয়ার করে অনেকে নিজের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষ বা শহিদ পরিবারগুলো দিনের পর দিন বঞ্চিত থেকে গেলেও, এই আন্দোলনকে ব্যবহার করে একদল মানুষ আজ রাজনৈতিক পদ ও ক্ষমতা ভোগ করছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের অনেকেই আজ চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং কলকাতার অতি ভিভিআইপি এলাকা হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে একাধিক অঢেল সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেছেন! অথচ, এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও বাংলার সাধারণ মানুষ আজও পুরোপুরি জানতে পারেনি যে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল। যাঁরা এই দিনটিকে পুঁজিপাট্টা বানিয়ে আজ দুবাই, সিঙ্গাপুর বা আমেরিকায় ওড়াউড়ি করছেন, তাঁদের থেকে বাংলার মানুষকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।

সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টের অসঙ্গতি তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মণীশ গুপ্তসহ মোট ৪৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে এই কমিশন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডেকেছিল। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, যিনি নিজেকে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সাক্ষী বা প্রধান কাণ্ডারি বলে দাবি করেন (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়), কমিশন আশ্চর্যজনকভাবে তাঁর কোনো সাক্ষ্যই গ্রহণ করেনি। মুখ্যমন্ত্রীর ইঙ্গিত, হয়তো পর্দার আড়াল থেকে এমন নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁকে ডাকাই না হয়।

এর পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরে এক মারাত্মক তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, মহাকরণ (রাইটার্স বিল্ডিংস) থেকে এই সংক্রান্ত বহু মূল ফাইল ও তদন্তের রিপোর্ট রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গিয়েছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা বড় বড় মাথাদের বাঁচাতেই কি এই ফাইল গায়েব করা হয়েছিল? মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, রাইটার্স থেকে ফাইল গায়েব হওয়ার এই ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে এবং এর জন্য একটি নতুন তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও একটি বড় তথ্য সামনে এসেছে। ২১ জুলাইয়ের গুলিচালনার ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে যাঁর নাম জড়িয়েছিল, সেই প্রাক্তন আমলা মণীশ গুপ্তকে পরবর্তীতে বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎমন্ত্রী করে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর নাম আর সামনে আসতে দেওয়া হয়নি। কমিশন মনে করছে, সেদিন মহাকরণ থেকে বহু দূরে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। ফলে “মহাকরণ দখল করতে আসছিল আন্দোলনকারীরা”—বিগত বাম সরকারের এই যুক্তির কোনো বাস্তব ভিত্তিই ছিল না।

বিগত তৃণমূল সরকার নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত সম্মান বা আর্থিক সাহায্য দেয়নি বলে এদিন বিধানসভায় সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। কমিশন যেখানে নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার সুপারিশ করেছিল, সেখানে বিগত সরকার মাত্র ২ লক্ষ টাকা দিয়ে দায় সেরেছিল। মুখ্যমন্ত্রী বড় ঘোষণা করে জানান, এবার বর্তমান বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল (Chief Minister’s Relief Fund) থেকে নিহতদের পরিবারকে ওই বকেয়া ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। একই সাথে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ওই দিনের ঘটনায় যাঁরা প্রকৃত বিচার পাননি বা নতুন করে তদন্ত চান, তাঁরা চাইলে এখন নতুন করে থানায় এফআইআর (FIR) দায়ের করতে পারেন।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২১ জুলাইয়ের ঠিক প্রাক্কালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই অফিশিয়াল রিপোর্ট প্রকাশ এক ধাক্কায় বিরোধীদের নৈতিক ভিত্তি ধূলিসাৎ করে দিল। শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকে যারা প্রতি বছর আবেগের তাস খেলেন, বিধানসভার এই সরকারি রিপোর্টের পর তাঁদের আসল চেহারাটা বাংলার মানুষের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল।