প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাঁকুড়ার লালমাটিতে বসন্তের বাতাস এখন রাজনৈতিক উত্তাপে তপ্ত। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজতেই ওন্দা বিধানসভা কেন্দ্রে তৈরি হয়েছে এক চরম নাটকীয় পরিস্থিতি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর থেকেই যেন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ খুলে গিয়েছে এই জনপদে। দলের ঘোষিত প্রার্থী সুব্রত দত্তকে বহিরাগত তকমা দিয়ে যেভাবে দেওয়াল লিখন এবং পোস্টার রাজনীতি শুরু হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটাই প্রশ্ন, ওন্দায় কি তবে তৃণমূলের ভরাডুবি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা? প্রার্থী হিসেবে সুব্রত দত্তর নাম আসতেই ওন্দার অলিগলি ভরে গিয়েছে ধিক্কার পোস্টারে। কোথাও লেখা— “চাই না আমরা বহিরাগত, চাই আমরা ওন্দা বিধানসভার ভূমিপুত্র”, আবার কোথাও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে দলীয় সিদ্ধান্তকে। তৃণমূলের আদি ও স্থানীয় কর্মীদের দাবি, যিনি এই এলাকার ধুলোবালির সাথে পরিচিত নন, তিনি কীভাবে বিধানসভায় ওন্দার মানুষের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরবেন? এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন এতটাই প্রকাশ্যে যে, খোদ তৃণমূল ভবনও এই নিয়ে যথেষ্ট অস্বস্তিতে।

বিগত ২০২১ সালের নির্বাচনে এই ওন্দা কেন্দ্র থেকেই বিজেপি প্রার্থী অমরনাথ শাখা তৃণমূলের অরূপ খাঁকে ১১,৫৫১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও এই বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির লিড ছিল চোখে পড়ার মত। তথ্য বলছে, ওন্দায় বিজেপির ভোট শতাংশ বর্তমানে ৪৬ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা তৃণমূলের চেয়ে অনেক বেশি। বিজেপি প্রার্থী এবং বর্তমান বিধায়ক অমরনাথ শাখা এলাকার ‘ঘরের ছেলে’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং সারাবছর মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা বিজেপিকে একধাপ এগিয়ে রেখেছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূল যদি প্রাক্তন বিধায়ক অরূপ খাঁকে প্রার্থী করত, তবে লড়াইটা অন্তত সমানে-সমানে হতো। কিন্তু বহিরাগত সুব্রত দত্তকে এনে তৃণমূল কার্যত বিজেপিকে ‘ওয়াকওভার’ দিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ওন্দার সাধারণ ভোটারদের মনে এখন একটাই সংশয়, তৃণমূলের এই আদি-নব্য দ্বন্দ্বের সুযোগ কি ১০০ শতাংশ কাজে লাগাবে বিজেপি? কেননা গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই কেন্দ্রে প্রায় ৬,০০০ ভোটের লিড ধরে রেখেছিল। এবার তৃণমূলের অন্দরে যে বিদ্রোহের সুর, তাতে তৃণমূলের একাংশ ভোট যদি বিজেপির বাক্সে যায় অথবা ভোটদান থেকে বিরত থাকে, তবে জয়ের ব্যবধান ২০,০০০ ছাড়িয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

প্রশ্ন উঠছে, অরূপ খাঁর অনুগামীরা কি আদৌ সুব্রত দত্তর হয়ে দেওয়াল লিখবেন? নাকি তলে তলে ‘পদ্ম’ চিহ্নে ভোট দেওয়ার জোয়ার আসবে? এই ‘সাসপেন্স’ এখন ওন্দার চায়ের দোকানে প্রধান আলোচনার বিষয়। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, ওন্দার মানুষ আর তৃণমূলের ‘তুষ্টিকরণ’ এবং ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি সহ্য করতে রাজি নয়। তার ওপর বহিরাগত প্রার্থী চাপিয়ে দিয়ে তৃণমূল ওন্দার মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত করেছে। বিজেপি নেতা অমরনাথ শাখার কথায়, “ওন্দার মাটি বীরের মাটি, এখানে বহিরাগতদের জায়গা নেই। মানুষ তৈরি হয়ে আছেন পদ্ম ফোটাতে।” এখন তৃণমূলের প্রার্থী বদলের এই মাস্টারস্ট্রোক কি শেষমেশ ‘বুমেরাং’ হতে চলেছে? ওন্দার দেওয়ালে দেওয়ালে যে প্রতিবাদের ভাষা ফুটে উঠেছে, তা কি ভোটের দিন ইভিএমে প্রতিফলিত হবে? সব মিলিয়ে ওন্দায় এখন টানটান উত্তেজনা। একদিকে বিজেপির সুসংগঠিত ‘ভূমিপুত্র’ ম্যাজিক, আর অন্যদিকে তৃণমূলের অন্দরে ‘বহিরাগত’ বিতর্ক। লড়াইটা এখন অসম, পাল্লা ভারী গেরুয়া শিবিরের দিকেই।