প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
আরজিকরের সেই কালরাত্রির ক্ষত আজও বাংলার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। সুবিচারের আশায় যখন একজন শোকাতুর মা আদালতের চৌকাঠ থেকে রাজপথের ধুলোয় বিচার খুঁজছেন, ঠিক তখনই রাজ্যের হেভিওয়েট মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিমের একটি মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের বারুদ উসকে দিল। নির্যাতিতার মায়ের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পদার্পণ নিয়ে মন্ত্রীর ‘টানাটানি’ তত্ত্ব কি কেবলই এক রাজনৈতিক বয়ান, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে শাসকের এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা? প্রশ্ন তুলছে ওয়াকিবহাল মহল। গতকাল সংবাদমাধ্যমের সামনে ফিরহাদ হাকিম দাবি করেছেন, নির্যাতিতার পরিবারকে নিয়ে বিজেপি এবং সিপিএমের মধ্যে ‘টানাটানি’ চলছে। তিনি আরও যোগ করেন, প্রশাসন ও পুলিশ প্রথম দিন থেকে যা বলেছিল, শেষ পর্যন্ত নাকি সেটাই ঠিক হয়েছে। তবে একজন জননেতার মুখ থেকে যখন ‘টানাটানি’র মত শব্দবন্ধ বেরিয়ে আসে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই ইঙ্গিত করে না, বরং শোকাতুর এক পরিবারের অস্তিত্বকে যেন নিছক একটি ‘রাজনৈতিক সামগ্রী’ হিসেবে লঘু করে দেখার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

আইনি সংজ্ঞায় কোনো মন্তব্য অপরাধ না হলেও, নৈতিকতার নিরিখে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিজেপি যখন একজন স্বজনহারা মা-কে লড়াইয়ের মঞ্চ দিতে চাইছে, তখন তাকে ‘রাজনীতি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া আসলে শাসক দলের অভ্যন্তরীণ শঙ্কারই প্রতিফলন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ যখন পদ্ম শিবিরের ছায়াতলে একত্রিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন তাকে ‘টানাটানি’ বলা কি আদতে মানুষের মৌলিক অধিকার ও আবেগকেই অস্বীকার করা নয়? বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করছেন, তাঁরা কোনো ‘টানাটানি’ নয়, বরং শোকাতুর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের দাবিকে শক্তিশালী করতে চান। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্যের রাজনৈতিক অধিকার থাকলেও, সুস্থ গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে সেই শব্দ চয়ন কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে বিতর্ক চিরন্তন। যখন বিষয়বস্তু একজন মৃত কন্যার বিচার এবং তাঁর মায়ের হাহাকার, তখন ‘কটাক্ষ’ করার প্রবণতা কি আসলে শাসকের নৈতিক রক্ষণভাগকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে না?

রাজনীতিতে হার-জিত থাকে, থাকে তীব্র বাকযুদ্ধও। কিন্তু লড়াইটা যখন একজন মায়ের—যিনি তাঁর সর্বস্ব হারিয়েছেন—তখন তাঁর হাত ধরবে কে, তা নিয়ে উপহাস কি অত্যন্ত অসংবেদনশীলতা নয়? বিজেপি এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছে, তাকে ‘রাজনৈতিক মাইলেজ’ হিসেবে না দেখে ‘বিকল্পের সন্ধান’ হিসেবে দেখার সময় এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। বাংলার সাধারণ মানুষ আজ প্রশ্ন তুলছে—মায়ের কান্না কি শুধুই হেডলাইনের খোরাক? নাকি ফিরহাদ হাকিমদের মত দাপুটে নেতাদের কাছে বিচারপ্রার্থী মুখগুলো শুধুই ভোটের ক্যালকুলেটর? এই বিতর্কের শেষ উত্তর দেবে সময়, আর বাংলার জাগ্রত বিবেক। আগামীর নির্বাচনই বলে দেবে, জননী হৃদয়ের এই ক্ষত কেবল ‘টানাটানি’র ইস্যু হয়েই রইল, নাকি তা এক বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সোপান হয়ে উঠল।