প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২১-এর সেই ঐতিহাসিক মেগা লড়াইয়ের স্মৃতি কি ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? আজ ভবানীপুরের মাটি থেকে নন্দীগ্রামের বর্তমান তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ ‘অস্বস্তিকর’ প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সরাসরি নাম না নিলেও, মেদিনীপুরের ভূমিপুত্রের নিশানায় আজ স্পষ্টতই ছিল তাঁরই একসময়ের ছায়াসঙ্গী। শুভেন্দুর তোলা ‘নৈতিকতা’ এবং ‘আন্দোলনের অবদান’ সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি এখন বঙ্গ রাজনীতির অলিন্দে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। শুভেন্দু অধিকারী আজ তাঁর বক্তব্যে তৃণমূলের প্রার্থী চয়নকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যে ভাইটিকে প্রার্থী করেছে, সেই ভাইটির নন্দীগ্রাম আন্দোলনে কোন ভূমিকা ছিল? ওই ভাইটি কি নন্দীগ্রামের শহীদ পরিবার এবং দুইজন অত্যাচারিত রমণীর নাম বলতে পারবে?” নিজের লড়াইয়ের ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে শুভেন্দু বলেন, বাম আমলে নন্দীগ্রামের মানুষের জন্য লড়তে গিয়ে তিনি নিজের কাঁধে ৪২টি ফৌজদারি মামলা নিয়েছেন। তাঁর দাবি, যখন রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছিল, তখন বর্তমান তৃণমূল প্রার্থীর কোনো টিকি দেখা যায়নি। শুভেন্দুর এই ‘ফ্যাক্ট-চেক’ কার্যত পবিত্র করকে আন্দোলনের ইতিহাসে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হিসেবে প্রমাণের এক কৌশলী চাল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রামের লড়াই বরাবরই আবেগের এবং অংকের। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত করেছিলেন। শুভেন্দুর আজকের বার্তার মূল সুর ছিল—যেই মাটিতে স্বয়ং দলনেত্রী প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, সেখানে তাঁর এক প্রাক্তন অনুগামীকে দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া কি সম্ভব? তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, নন্দীগ্রামের মানুষ একবার রায় দিয়ে দিয়েছেন, বারবার তাঁদের ‘পরীক্ষা’ নেওয়া মানে তাঁদের আত্মসম্মানে আঘাত করা।
বলা বাহুল্য, পবিত্র কর একসময় শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিজেপির টিকিটে জিতে তিনি বোয়াল-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য হয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি ভোল বদলে তৃণমূলে যোগ দেন এবং শাসকদল তাঁকে বড় বাজি হিসেবে নন্দীগ্রামে প্রার্থী করে। শুভেন্দু আজ এই ‘সুবিধাবাদী’ রাজনীতির ওপর আঘাত করে বলেন, “ওই ভাইটির উচিত বিজেপির পঞ্চায়েত মেম্বারশিপ ছেড়ে নির্বাচনে লড়াই করা নৈতিকভাবে।” আইনত, পদ না ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেওয়া ‘দলত্যাগ বিরোধী আইনের’ আওতায় পড়তে পারে, যা পবিত্র করের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। শুভেন্দু নিজেকে নন্দীগ্রামের ‘ভূমিপুত্র’ এবং আন্দোলনের কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিপরীতে পবিত্র করকে ‘দলত্যাগী’ এবং ‘সুবিধাবাদী’ হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের মনে অনাস্থা তৈরির কৌশল নিয়েছেন। ২০০৭-এর নন্দীগ্রাম আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেই শহীদ পরিবারগুলোর আবেগ আজও তীব্র। শুভেন্দু প্রশ্ন তুলেছেন, যারা আন্দোলনের সময় পাশে ছিল না, তারা আজ ভোটের সময় কোন মুখে ভোট চাইবে? ২০২১-এর জয়ের পর থেকে নন্দীগ্রামে বিজেপি তাদের ঘর গুছিয়েছে। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনেও নন্দীগ্রামের সিংহভাগ আসনেই গেরুয়া ঝড় বজায় ছিল। সেই শক্ত জমির ওপর দাঁড়িয়ে শুভেন্দুর এই আক্রমণ তৃণমূলের ঘরোয়া কোন্দলকে আরও উস্কে দিতে পারে।
ভবানীপুর থেকে ছোঁড়া শুভেন্দুর এই তির কি সত্যিই পবিত্র করের জয়ের পথে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে? নাকি তৃণমূল আন্দোলনের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে শুভেন্দুকে টেক্কা দেবে? রাজনৈতিক মহলের মতে, শুভেন্দুর আজকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বয়ান এবং পরিসংখ্যানের আক্রমণ শাসকদলের অস্বস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৬-এর মহারণে নন্দীগ্রামের মাঠ যে উত্তপ্ত হতে চলেছে, তার মহড়া আজই শুরু হয়ে গেল।