প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণভেরি বেজে গিয়েছে। আর যুদ্ধের শুরুতেই নিজের খাসতালুক ভবানীপুর নিয়ে শাসক শিবিরের অন্দরে যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে গেল। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই বিশেষ কর্মিসভায় যে সুর শোনা গেল, তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ‘হারের আতঙ্ক’ বা ‘চরম আত্মবিশ্বাসহীনতা’ বলে অভিহিত করছেন।

এদিনের সভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বুথ স্তরের কর্মীদের টার্গেট বেঁধে দিয়ে জানিয়েছেন, ভবানীপুরে শুধু জয় হাসিল করলেই চলবে না, জয়ের ব্যবধান হতে হবে অন্তত ৬০ হাজার ভোটের বেশি। উল্লেখ্য, ২০২১-এর উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৫৮,৮৩২ ভোটে জিতেছিলেন। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, নিজের রেকর্ড নিজেই ভাঙার এই মরিয়া তাগিদ কেন? তবে কি নিচুতলার রিপোর্টে মাটি আলগা হওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছেন ভাইপো? কর্মীদের চাঙ্গা করতে অভিষেক নির্দেশ দিয়েছেন, প্রতিটি বুথে অন্তত ৫টি করে নতুন ভোট নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধীদের দাবি, এই ‘৫ ভোটের ফর্মুলা’ আসলে ছাপ্পা ভোট বা ভোটার তালিকায় কারচুপির এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো কর্মীদের প্রতি অভিষেকের হুঁশিয়ারি। তিনি সাফ জানিয়েছেন, “কার বুথে কেমন কাজ হচ্ছে, তা দেখার জন্য এক ধরণের অদৃশ্য সিসিটিভি লাগানো আছে”। নিজের দলের কর্মীদের ওপরেই এই ধরণের গোয়েন্দাগিরি বা নজরদারির নিদান আসলে ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’ দেখার শামিল বলে মনে করছে বিজেপি নেতৃত্ব। গেরুয়া শিবিরের কটাক্ষ, তৃণমূল কর্মীরাই এখন পিসি-ভাইপোর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তাই তাঁদের ভয় দেখিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন তাঁর ভাষণে ভবানীপুরকে নিজের ‘মা’ বলে সম্বোধন করলেও তাঁর কথায় বারবার ফিরে এসেছে নন্দীগ্রামের পরাজয়ের স্মৃতি। ভোট মিটে যাওয়ার পর স্ট্রং রুম এবং ইভিএম-এর ওপর কড়া নজর রাখার যে নির্দেশ তিনি দিয়েছেন, তা থেকে পরিষ্কার যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারায় কারচুপির সুযোগ না পাওয়াই তাঁর প্রধান চিন্তার কারণ। বিজেপি ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হারের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের কেন্দ্রেও নিরাপদ বোধ করছেন না।

এবারের লড়াই আক্ষরিক অর্থেই হাই-ভোল্টেজ, কারণ মমতার বিপরীতে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন স্বয়ং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, তারা ভবানীপুর থেকে ২৫ হাজার ভোটের লিড নিয়ে বেরোবে। গত লোকসভা নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভবানীপুরের বেশ কিছু ওয়ার্ডে বিজেপির ভোট শতাংশ লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে মমতার কান্নাকাটি আসলে পরাজয়ের আগাম অজুহাত খাড়া করা বলেই মনে করছে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহল।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১-তে মমতার জয়ের ব্যবধান ৫৪ হাজার থাকলেও ২০১৬-তে তা নেমে এসেছিল মাত্র ২৫ হাজারে। ২০২৬-এ সেই গ্রাফ আরও নিচে নামার আশঙ্কায় এখন থেকেই ‘৬০ হাজারি’ লক্ষ্যের কথা বলে কর্মীদের চাপে রাখছে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু ভবানীপুরের সচেতন জনতা কি সত্যিই এই টার্গেট পূরণ করবে, নাকি শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে নিজের ঘরেই ধূলিসাৎ হবে মমতার অহংকার? উত্তর দেবে ২০২৬-এর ইভিএম।