প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে যেখানে এক ক্লিকেই সমস্ত তথ্য হাতের মুঠোয় চলে আসার কথা, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব রহস্য। সোমবার গভীর রাতে বহু প্রতীক্ষিত এই তালিকা প্রকাশের প্রায় ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হতে চলল, কিন্তু সাধারণ ভোটারদের কাছে সেই তালিকার নাগাল পাওয়া এখনও যেন এক দুর্ভেদ্য ধাঁধা। পার্ট নম্বর দিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তথ্য। উল্টে সিইও (CEO) ওয়েবসাইটের পাতায় ভেসে উঠছে এক রহস্যময় বার্তা— ‘বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনও বিবেচনাধীন নেই’। এই বিলম্ব এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে গভীর সংশয় ও কৌতূহল।
সাধারণত ভোটার তালিকা সংশোধনের পর সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ থাকে। বিশেষ করে যাদের নাম আগে তালিকায় ছিল না বা যারা নতুন ভোটার হিসেবে আবেদন করেছিলেন, তাদের জন্য এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মঙ্গলবার সারাদিন রাজ্যজুড়ে দেখা গেল এক অন্য চিত্র। শয়ে শয়ে ভোটার তাদের এপিক (EPIC) কার্ড নম্বর বা বুথ নম্বর দিয়ে সার্চ করলেও ওয়েবসাইটের সার্চ রেজাল্ট দেখাচ্ছে শূন্য। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, তালিকা কি তবে কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ? ডিজিটাল মাধ্যমে কেন তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না? বিশেষ করে ‘বিবেচনাধীন’ বা ‘Under Adjudication’ থাকা লক্ষ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য ঠিক কী অবস্থায় রয়েছে, তা নিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা বজায় রয়েছে প্রশাসনিক মহলে।
বিভ্রান্তি যখন চরমে, তখন মুখ খুলেছেন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত। তাঁর বয়ানে অবশ্য আশ্বাসের চেয়ে রহস্যই বেশি দানা বেঁধেছে। তিনি জানিয়েছেন, “যে পার্টগুলো হয়ে গেছে, শুধুমাত্র সেই পার্টগুলিই এখন দেখতে পাবেন।” কিন্তু প্রশ্ন এখানেই— ঠিক কতগুলি পার্টের কাজ শেষ হয়েছে? আর কতগুলো পার্ট এখনও বাকি? কেনই বা তালিকা প্রকাশের কথা ঘোষণা করার পর সমস্ত পার্ট একসঙ্গে আপলোড করা সম্ভব হলো না? এই খণ্ড খণ্ড তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়া সাধারণ ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যারা নিজেদের নাম খুঁজে পাচ্ছেন না, তারা বুঝতে পারছেন না তাদের আবেদন বাতিল হয়েছে নাকি এখনও তা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জালে আটকে।
জানা গেছে, প্রায় ৬০ লক্ষাধিক ভোটারের নাম ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম যাচাই করার জন্য ৭০৫ জন বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু সোমবার রাতের পর থেকে ওয়েবসাইটের যে হাল, তাতে মনে হচ্ছে এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাজিয়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনও তথ্য না মেলায় সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। অনেকেই সাইবার ক্যাফে বা বাড়িতে বসে বারবার রিফ্রেশ করছেন পেজ, কিন্তু উত্তর মিলছে না।
ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর ভোটার তালিকা নিয়ে এই ধরণের ধীরগতি বা যান্ত্রিক বিভ্রাট সচরাচর চোখে পড়ে না। যেখানে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে কাজ শেষ হওয়ার কথা, সেখানে ওয়েবসাইটের এই ‘অজ্ঞাত’ আচরণ নিয়ে চায়ের দোকানে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কেউ কেউ বলছেন এটি নিছক সার্ভারের ত্রুটি, আবার কেউ মনে করছেন পর্দার আড়ালে হয়ত এখনও চলছে বড় কোনও রদবদল। এই ডিজিটাল লুকোচুরির মাঝে সাধারণ ভোটারের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া নিয়ে এক অদৃশ্য ‘সাসপেন্স’ কাজ করছে গোটা রাজ্যজুড়ে।
শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, তথ্য আপডেটের কাজ নেপথ্যে চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে সাধারণ ভোটারদের জন্য সেই কাঙ্ক্ষিত নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কখন সম্পূর্ণভাবে এবং নির্বিঘ্নে উন্মুক্ত হবে, তা এখনও এক বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্ন। এই অপেক্ষা আর কতক্ষণের, সেই উত্তর এখন সময়ের হাতে।