প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নিল। যে বাম-আইএসএফ জোটকে একসময় ‘বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী’ বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছিল, তা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার মুখে। সৌজন্যে—আসন ভাগাভাগি নিয়ে চরম অরাজকতা এবং ক্যানিং পূর্বে তৃণমূল ত্যাগী নেতা আরাবুল ইসলামকে আইএসএফ (ISF)-এর প্রার্থী করা। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের অন্দরে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে শুধু ক্ষোভ আর হতাশার সুর। জোটের ভবিষ্যৎ এখন কার্যত খাদের কিনারায়।

এই বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্যানিং পূর্বের আইএসএফ প্রার্থী আরাবুল ইসলাম। উল্লেখ্য, আরাবুল ইসলাম দীর্ঘকাল তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থেকে ভাঙড় ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাম কর্মীদের ওপর একচেটিয়া ‘সন্ত্রাস’ চালিয়েছেন বলে অভিযোগ ছিল খোদ সিপিএমের। গত কয়েক বছরে ভাঙড়ের মাটিতে লাল ঝাণ্ডা ধরার অপরাধে যাঁদের ঘরছাড়া হতে হয়েছিল বা মিথ্যে মামলায় জেল খাটতে হয়েছিল, আজ তাঁদেরই সেই ‘আরাবুল’কে সমর্থনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
সিপিএমের নিচুতলার কর্মীরা এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। তাঁদের স্পষ্ট প্রশ্ন— “যাঁর অত্যাচারে আমাদের কমরেডরা রক্তাক্ত হয়েছেন, আজ তাঁর নামেই স্লোগান দেব? এটা কি বামপন্থার আদর্শ না কি ক্ষমতার লোভ?” এই ক্ষোভের আঁচ এতটাই তীব্র যে, ক্যানিং পূর্ব সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় বাম কর্মীরা আইএসএফ-এর মিছিলে পা মেলাতে অস্বীকার করছেন। সিপিএম স্পষ্ট জানিয়েছে, আরাবুলকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।

শুধুমাত্র আরাবুল ইসলাম ইস্যু নয়, আসন বণ্টন নিয়েও বাম শরিকদের মধ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। ফরওয়ার্ড ব্লক (FB) এবং আরএসপি (RSP)-র মতো পুরনো শরিকরা সরাসরি অভিযোগ তুলেছে যে, আইএসএফ-কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে বামেদের চিরাচরিত ঘাঁটিগুলো হাতছাড়া করা হচ্ছে। আইএসএফ-এর ‘একগুঁয়েমি’ এবং একের পর এক বিতর্কিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা বামফ্রন্টের অন্দরে বিভাজন স্পষ্ট করে দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সিপিএম নেতৃত্ব হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে আইএসএফ যদি বিতর্কিত আসনগুলো থেকে প্রার্থী না সরায়, তবে তারা পাল্টা প্রার্থী দেবে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে জোট এখন নিজেদের মধ্যেই ‘বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই’ বা আত্মঘাতী দ্বন্দ্বে লিপ্ত।

বামেদের চূড়ান্ত অস্বস্তিতে ফেলে দিয়ে আইএসএফ ইতিমধ্যেই তিনটি এমন আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, যেখানে বামেরা আগে থেকেই নিজেদের প্রার্থী ঠিক করে রেখেছিল। মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বাধীন আলিমুদ্দিন যখন বারবার অনুরোধ করছে যে ‘বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী’ ভোট ভাগাভাগি রুখতে আইএসএফ যেন সংযত হয়, তখন আব্বাস সিদ্দিকীর দল বিন্দুমাত্র নতিস্বীকার করতে নারাজ। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই জোট আসলে কোনো আদর্শগত মিলের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি একটি নিছক ‘সুবিধাবাদী আঁতাত’ ছিল যা ভোটের আগেই মুখ থুবড়ে পড়ল।

প্রথম থেকেই বলা হয়েছিল যে, এই জোট আসলে একটি ‘অপবিত্র আঁতাত’। বামেদের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ যে কতটা ঠুনকো, তা আরাবুল ইসলামের মত বিতর্কিত মুখকে জোটের অংশ করা থেকেই প্রমাণিত। যেখানে একটি জোটের শরিকরাই একে অপরের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না এবং প্রকাশ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করছে, সেখানে রাজ্যের সাধারণ মানুষ তাঁদের ওপর কীভাবে ভরসা রাখবে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জোট এখন আইসিইউ-তে। ক্যানিং পূর্ব, অশোকনগর বা আমডাঙার মত আসনগুলোতে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে, তা সারা রাজ্যে জোটের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, তাসের ঘরের মতো সাজানো এই বাম-আইএসএফ জোট এখন ধূলিসাৎ হওয়ার অপেক্ষায়।