প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
পুরুলিয়ার লাল মাটিতে পা দিয়েই ফের চিরচেনা মেজাজে ফিরলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবারের জনসভায় তাঁর তূণ থেকে উন্নয়নের খতিয়ানের বদলে বেরিয়ে এল পুরনো সেই ‘ইমোশনাল কার্ড’। বিরোধী শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন একের পর এক দুর্নীতির ফাইল খুলতে শুরু করেছেন এবং নির্বাচনী ময়দানে সুর চড়াচ্ছেন, ঠিক তখনই পাল্টা চাল হিসেবে দিদি ছুড়ে দিলেন এক নাটকীয় প্রশ্ন— “আমাকে আবার মারার প্ল্যান করছো নাকি?” রবিবার মানবাজারের সভা থেকে তাঁর এই মন্তব্য শুনে রাজনৈতিক মহলের একাংশের টিপ্পনি, “চাপ যখন চারদিক থেকে বাড়ছে, তখন একটু জন-সহাসুভূতি কুড়োনোর মরিয়া চেষ্টা তো করতেই হয়!”

সম্প্রতি বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্যে তৃণমূল নেত্রীর পুরনো চোট ও ‘ব্যান্ডেজ-রাজনীতি’ নিয়ে খানিকটা ব্যাঙ্গাত্মক খোঁচা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের রসবোধ হজম করা বোধহয় বেশ কঠিন। তাই দেরি না করে সেই শ্লেষকেই সরাসরি ‘প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিত্রায়িত করতে কোমর বেঁধে নেমেছেন নেত্রী। জনসভায় তাঁর প্রশ্ন করার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন বিরোধী শিবিরকে নয়, বরং কোনো সিনেমার খলনায়ককে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বিধানসভা নির্বাচনে ‘ভাঙা পা’ আর ‘ব্যান্ডেজ’ যে জাদুকরী কাজ করেছিল, সেই একই আবেগ উসকে দিয়ে ভোটারদের মনে স্থান করে নেওয়াই এখন ঘাসফুল শিবিরের মূল রণকৌশল।

নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন বন্টন কেলেঙ্কারি— একের পর এক কেন্দ্রীয় তদন্তের ঝড়ে যখন দলীয় নেতা-মন্ত্রীরা জেরবার, তখন জনগণের নজর ঘোরানোর এর চেয়ে কার্যকর রাস্তা আর কী-ই বা হতে পারে! বিজেপির স্থানীয় এক নেতার কথায়, “আমরা বলছি বেকারদের চাকরির কথা, উন্নয়নের কথা— আর উনি বলছেন ওনাকে মারার প্ল্যান হচ্ছে। আসলে হারের ভয়ে দিদি এখন নিজের ছায়াকেই ভয় পাচ্ছেন।” যখনই প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখনই নেত্রীর এই ‘আক্রান্ত হওয়ার’ গল্প সামনে চলে আসে, যাকে অনেকে ‘ভিক্টিম কার্ড’ বলে অভিহিত করছেন।

খোদ শাসক দলের অন্দরেও এখন চাপা ফিসফাস— “পুরনো সেই ষড়যন্ত্রের স্ক্রিপ্ট কি আজও মানুষ খাবে?” রোদ চশমা চোখে দিয়ে দিদির এই আক্রমণাত্মক মেজাজ হয়ত সভায় হাততালি কুড়োচ্ছে, কিন্তু বাস্তব সমস্যাগুলো কি এতে ধামাচাপা পড়বে? বিরোধীদের দাবি, চোট আর ষড়যন্ত্রের এই পুরনো আখ্যান এখন সাধারণ মানুষের কাছে বড্ড একঘেয়ে লাগছে। উন্নয়নের রিপোর্ট কার্ড যখন কার্যত শূন্য, তখন কাল্পনিক বিপদের গল্প শুনিয়ে কতদিন টিকে থাকা যায়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, ভোট যত এগোচ্ছে, দিদির এই ‘ভীতি প্রদর্শন’ আর ‘ষড়যন্ত্রের’ রাজনীতি ততই দানা বাঁধছে। তবে বাংলার সচেতন ভোটাররা এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী। তাঁরা কি এবারও আবেগের এই টোপ গিলবেন, না কি দুর্নীতির পাহাড় দেখে ইভিএমে জবাব দেবেন— তার উত্তর দেবে সময়। আপাতত পুরুলিয়ার তপ্ত বাতাসে দিদির এই নয়া ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা’ রাজ্য রাজনীতির আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।