প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাংলার রাজনীতিতে সৌজন্য এখন অনেকটা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মতো। তবে সৌজন্য না থাকলেও বিনোদনের যে অভাব নেই, তার হাতে-কলমে প্রমাণ মিলল খোদ মুখ্যমন্ত্রীর পাড়া ভবানীপুরে। আসন্ন ২০২৬-এর মহাযুদ্ধের দামামা বাজতে না বাজতেই ময়দানে নেমে পড়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। আর তাঁকে সামনে পেয়েই যেন সাতসকালে বসন্তের কোকিলের মতো গান ধরল শাসকদলের একঝাঁক অতি-উৎসাহী কর্মী। তবে সেই গান ঠিক সুরের নয়, বরং রাজনৈতিক ‘স্লোগান-যুদ্ধের’।
ভবানীপুরের চেতলা থেকে যদুবাবুর বাজার—যেখানেই বিরোধী দলনেতা পা রাখছেন, সেখানেই আগেভাগে হাজির হয়ে যাচ্ছেন ঘাসফুল শিবিরের অনুগামীরা। তাঁদের গলায় সেই অতি-পরিচিত ‘জয় বাংলা’ আর ‘চোর-চোর’ ধ্বনি। মজার বিষয় হলো, যে স্লোগান দিয়ে গত কয়েকটা নির্বাচন পার করা হয়েছে, তাতে নতুনত্ব খুঁজছেন খোদ এলাকার সাধারণ মানুষও। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে এক প্রবীণ নাগরিককে মুচকি হেসে বলতে শোনা গেল, “ওনারা তো নিজেদের ডিউটি করছেন, কিন্তু স্লোগানের স্ক্রিপ্টটা বোধহয় এবার একটু বদলানোর সময় এসেছে। একই রেকর্ড কতবার শুনব?” আসলে প্রতিবাদের ভাষা যখন একঘেয়ে হয়ে যায়, তখন তা প্রতিবাদের চেয়ে বেশি ‘অভ্যাসে’ পরিণত হয়, যা ভবানীপুরের রাস্তায় স্পষ্ট।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, শাসকদলের এই উচ্চকিত চিৎকারের সামনে বিজেপি কর্মীরা কিন্তু বেশ ধ্রুপদী মেজাজে। শুভেন্দু অধিকারীকে দেখা গেল কোনো উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ায় না গিয়ে শান্তভাবে মানুষের ঘরের দুয়ারে পৌঁছে যেতে। বিরোধী দলনেতার সেই বিশেষ ‘মুচকি হাসি’ যেন বারবার একটা কথাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল—রাস্তার ধারের প্রতিবাদ যত জোরালো হবে, প্রচারের আলো তত বেশি তাঁর দিকেই ঘুরবে। বিজেপির পাল্টা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি যখন উঠছে, তখন তা কেবল একটা ধর্মীয় বা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের আত্মবিশ্বাস হিসেবেই ধরা দিচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে। শুভেন্দুর শরীরী ভাষা বুঝিয়ে দিচ্ছে, তিনি এখন আর শুধু নন্দীগ্রামের গণ্ডিতে আটকে নেই, বরং সরাসরি ‘ম্যাডামে’র দুর্গে হানা দিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত।
দুই শিবিরের এই স্লোগান-বিলাসের মাঝে সবথেকে বেশি ঘাম ঝরছে কলকাতা পুলিশের। মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁদের যা অবস্থা, তাতে মনে হচ্ছে তাঁরা যেন কোনো হাই-ভোল্টেজ ফুটবল ডার্বির মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে পেনাল্টি আটকানোর চেষ্টা করছেন। এক পক্ষ হুঙ্কার ছাড়ছে, অন্য পক্ষ পাল্টা গর্জনে আকাশ ফাটাচ্ছে। মাঝে পড়ে উর্দিধারীরা না পারছেন সরাতে, না পারছেন থামাতে। একেই বলে ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ পরিস্থিতি। আমজনতার কাছে এই দৃশ্য বিনোদনের খোরাক হলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কাছে এটা এক প্রকার অগ্নিপরীক্ষা।
রাজনৈতিক মহলের অন্দরে এখন কান পাতলে একটাই ফিসফাস—ভবানীপুরের এই ‘স্লোগান-যুদ্ধ’ আসলে এক গভীর অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ। যে মাঠে বিরোধী দলনেতা এত সহজে ঢুকে বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিলি করছেন, সেখানে স্লোগান দিয়ে তাঁকে আটকানোর মরিয়া চেষ্টা আদতে শাসকদলের স্নায়ুচাপেরই লক্ষণ কি না, সেই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। হয়ত ঘাসফুল শিবির ভুলে যাচ্ছে যে, রাজনীতির ময়দানে স্লোগান দিয়ে প্রতিপক্ষের কান তালি দেওয়া সম্ভব ঠিকই, কিন্তু ব্যালট বক্সের নীরব আওয়াজ যখন বেরোয়, তখন তা অনেক বেশি গম্ভীর এবং শক্তিশালী হয়। স্লোগানে লোক জড়ো হয় ঠিকই, কিন্তু ভোট যে কোন দিকে ঝোঁকে, তা বোঝা মুশকিল।
বিরোধী দলনেতার এই জনসংযোগ যাত্রা কি শেষ পর্যন্ত ভবানীপুরের ভোটারদের মনের অন্দরে পৌঁছাতে পারবে? না কি এই স্লোগান-যুদ্ধ কেবল রাস্তার ধুলোবালি উড়িয়েই শান্ত হবে? উত্তরটা ২০২৬-এর বাক্সে বন্দি। তবে আপাতত ভবানীপুরের অলিগলি কিন্তু রাজনৈতিক বিনোদনের কোনো খামতি রাখছে না। একদিকে উন্নয়নের লম্বা দাবি, অন্যদিকে দুর্নীতির ভুরিভুরি অভিযোগ—সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতি এখন স্লোগানে স্লোগানে সরগরম। শেষ হাসি কে হাসবেন, তা সময় বলবে, তবে আপাতত ‘স্লোগান-বিলাস’ জারি রয়েছে পুরোদমে।