প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু বাংলার রাজনীতির ময়দান এখনই তপ্ত। এবার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু কোনো জনসভা নয়, খোদ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-র (CEO) দপ্তরের দোতলা! সৌজন্যে—তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার পুরুলিয়ার লাল মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি যে ‘পেটি-বোমা’ ফাটালেন, তাতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। তবে অভিষেকবাবুর এই চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরে পাল্টা একগুচ্ছ ‘তেজি’ প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার বিকেলে। পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডিতে নির্বাচনী জনসভা করছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মাইক হাতে মেজাজে ভাষণ দেওয়ার মাঝেই হঠাৎ তিনি এক নতুন তথ্য নিয়ে হাজির হন। তারপরেই কলকাতায় সিইও দফতরে চলে আসেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে তিনি দাবি করেন, সভার মাঝেই তাঁর কাছে খবর এসেছে যে কলকাতার সিইও অফিসে আলাদা করে বিপুল পরিমাণ ‘ফর্ম-৬’ (নতুন ভোটার হওয়ার আবেদনপত্র) জমা দেওয়া হচ্ছে। অভিষেকবাবুর ভাষায়, “কিছু লোক যাঁরা আমাদের বাংলাকে ভালোবাসেন, এখানে কাজ করেন, তাঁরাই আমাদের এই ভিডিও ও তথ্য পাঠিয়েছেন।”এরপরই তিনি তাঁর ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। যেখানে দেখা যাচ্ছে, সিইও দপ্তরের দোতলায় পেটি ধরে ধরে ফর্ম-৬ মজুত রাখা হয়েছে। অভিষেকবাবুর সরাসরি তোপ—বিজেপি নাকি উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে ‘বহিরাগত’ ভোটারদের নাম পশ্চিমবঙ্গের তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা করছে যাতে রাজ্যের জনবিন্যাস বা ডেমোগ্রাফি বদলে দেওয়া যায়। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টার সিসিটিভি ফুটেজ জনসমক্ষে আনুক কমিশন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই রণংদেহি মেজাজ দেখে রাজনৈতিক কারবারিরা মুচকি হাসছেন। তাঁদের তোলা পাল্টা প্রশ্নগুলো কিন্তু বেশ জমজমাট। সরকারি দপ্তরের অন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ বা ভিডিও যদি নিমেষে কোনো রাজনৈতিক নেতার হোয়াটসঅ্যাপে পৌঁছে যায়, তবে সেই অফিসের গোপনীয়তা নিয়ে তো খিলখিল করে হাসাহাসি হতেই পারে! নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন, এটা কি স্রেফ খবর পাওয়া, না কি প্রশাসনিক সিস্টেমের ভেতরেই তৃণমূলের এমন কিছু ‘বিশেষ বন্ধু’ বসে আছেন যারা সিইও-র চেয়ারের নিচ দিয়ে ভিডিও পাচার করছেন? এতে কি নিরপেক্ষ সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না?
ভোটার তালিকা সংশোধন বা নতুন নাম নথিভুক্তকরণ একটি রুটিন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ফর্ম-৬ জমা হওয়া বা দপ্তরে তা মজুত রাখা কি খুব অস্বাভাবিক? বিরোধীদের মস্করা—অভিষেকবাবুর চোখে কি বিশেষ কোনো ‘এক্স-রে’ আছে যার মাধ্যমে তিনি পেটির বাইরে থেকেই বুঝে গেলেন ভেতরে কাদের ফর্ম আছে? পেটির গায়ে কি ভিন রাজ্যের স্ট্যাম্প মারা ছিল? বৈধ পদ্ধতিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরে কি আসলে নির্বাচন কমিশনের ওপর আগাম চাপ তৈরির কৌশল নেওয়া হচ্ছে?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কমিশন সিসিটিভি ফুটেজ না দেখায়, তবে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’ স্লোগান তুলে মাঠ গরম করার রসদ তৈরিই আছে তৃণমূলের। এটি কি তবে হারের ভীতি থেকে আগাম অজুহাত সাজিয়ে রাখা? না কি কেন্দ্রীয় সংস্থাকে কোণঠাসা করার এক সুপরিকল্পিত চাল?
অভিষেক সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে এটি ‘বিজেপি-ইসিআই নেক্সাস’ বা আঁতাত। তবে কোনো অকাট্য প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ আইনি দিক থেকে কতটা পোক্ত, তা নিয়ে ধন্দ আছে। কমিশন এখনও সরকারিভাবে কোনো উত্তর না দিলেও, সূত্রের খবর—নিয়ম মেনেই ফর্ম জমা নেওয়া হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, অফিসের এক তলা থেকে দোতলায় ফাইল তোলাটা যদি ‘বিগ ফাইট’-এর ইস্যু হয়, তবে আগামী দিনে ভোটার কার্ডের প্লাস্টিকটা কোন রাজ্য থেকে আসছে, তা নিয়েও হয়তো সিবিআই তদন্তের দাবি উঠতে পারে!
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘পেটি-পুরাণ’ শেষ পর্যন্ত কোনো বড় কেলেঙ্কারি ফাঁস করবে, না কি স্রেফ নির্বাচনী চমক হিসেবেই থেকে যাবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—২০২৬-এর লড়াইটা শুধু ইভিএম-এ নয়, সিসিটিভি ফুটেজ আর মোবাইল ভিডিওর কাঁধে ভর করেও লড়া হবে। বাংলার মানুষ এখন দেখছে, এই ডিজিটাল যুদ্ধে শেষ হাসি কে হাসে। কমিশন কি এই পেটি রহস্যের সমাধান করবে, নাকি স্রেফ এক গাল হেসে একে ‘পলিটিক্যাল ড্রামা’ বলে উড়িয়ে দেবে? নজর থাকবে সেদিকেই।