প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট- বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে যখন বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর ভাবাবেগ নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে, ঠিক তখনই কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রর একটি বিতর্কিত মন্তব্য শাসকদলকে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিদের একচেটিয়া অবদানের কথা তুলে ধরতে গিয়ে গুজরাটি সমাজ ও দেশপ্রেমিক বীর সাভারকারকে নিয়ে তাঁর করা মন্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই বিতর্কের জল মাপতে আসরে নামতে হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে তৃণমূল ভবনের এক সাংবাদিক বৈঠক থেকে। সেই রেশ কাটাতে তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নেয় তৃণমূল কংগ্রেস। কলকাতার ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের ডিক্সন লেনে (Dixon Lane) স্থানীয় গুজরাটি সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের নিয়ে একটি জরুরি সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিশেষ লিখিত বার্তা পড়ে শোনান।রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও জনসংযোগের নতুন নজির গড়ে অসীম বসু মুখ্যমন্ত্রীর সেই বার্তাটি হিন্দি ও ইংরেজি ছাড়াও বিশেষভাবে গুজরাটি ভাষায় অনুবাদ করে শোনান। তৃণমূলের লক্ষ্য ছিল, যাতে ভাষার বাধায় মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতা ওই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাধা না পায়। কাউন্সিলর অসীম বসু সাফ জানান, মহুয়া মৈত্র যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত এবং দল এই ধরণের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যকে কোনওভাবেই সমর্থন করে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বার্তায় অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট সাংসদ দলের কোনো অনুমোদন না নিয়েই ওই ধরণের মন্তব্য করেছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার সমস্ত গুজরাটি ভাই ও বোনেদের কাছে এই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমি আপনাদের জন্য গর্বিত এবং আপনাদের অবদানকে সম্মান করি।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন সাংসদের মন্তব্যের জন্য দলের সুপ্রিমোর এইভাবে ক্ষমা চাওয়া নজিরবিহীন, যা স্পষ্ট করে দেয় যে তৃণমূল এই মুহূর্তে কোনোভাবেই গুজরাটি ভোটব্যাঙ্ককে চটাতে নারাজ।
তৃণমূলের এই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষত মেরামতের নেপথ্যে কাজ করছে সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক সমীকরন। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডটি মূলত গুজরাটি ও অহিন্দিভাষী মানুষ অধ্যুষিত। নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, বিগত লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে এই নির্দিষ্ট পকেটে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির তুলনায় পিছিয়ে ছিল। যেহেতু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এবার ভবানীপুরের প্রার্থী, তাই এই ওয়ার্ডের একটি ভোটও হাতছাড়া হওয়া মানে তাঁর জয়ের ব্যবধানে প্রভাব পড়া। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মহুয়া মৈত্রের মন্তব্যকে হাতিয়ার করে বিজেপি যাতে এই অঞ্চলে ‘বাঙালি বনাম অবাঙালি’ মেরুকরণ করতে না পারে, তার জন্যই এই আগাম সতর্কতা। বীর সাভারকারকে নিয়ে করা কটাক্ষকে বিজেপি জাতীয় স্তরে ইস্যু করার সুযোগ পেয়েছিল, যা রুখতে মমতার ক্ষমাপ্রার্থনা একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। তৃণমূল যখন গোয়া বা ত্রিপুরার মতো ভিনরাজ্যে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে চাইছে, তখন কোনো একটি নির্দিষ্ট বীর জাতিকে (গুজরাটি) আক্রমণ করলে দলের সর্বভারতীয় গ্রহণযোগ্যতা ধাক্কা খেতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে হস্তক্ষেপ করে বার্তা দিলেন যে, তাঁর রাজনীতি ‘সবকা সাথ’ তত্ত্বে বিশ্বাসী।
উল্লেখ্য, তৃণমূল ভবনের সেই সাংবাদিক বৈঠকে মহুয়া মৈত্র দাবি করেছিলেন যে, ব্রিটিশ আমলের কুখ্যাত সেলুলার জেলে (কালাপানি) বন্দিদের ৬৮ শতাংশই ছিলেন বাঙালি এবং বাকিরা পাঞ্জাবি। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, “বীর সাভারকার ছাড়া আর কোন গুজরাটি সেখানে ছিলেন? আর বীর সাভারকারও তো ক্ষমা চেয়ে ব্রিটিশদের চিঠি লিখেছিলেন।” ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে অন্য জাতির অবদানকে অস্বীকার বা লঘু করার এই প্রয়াসই মূলত সাধারণ মানুষের মনে আঘাত দিয়েছে। সাংসদের এই কড়া বাচনভঙ্গি যে দলের অভ্যন্তরেও সমালোচিত হচ্ছে, তা অসীম বসুর বক্তব্যের মাধ্যমে দিনের আলোর মত পরিষ্কার। এখন দেখার, ডিক্সন লেনের এই ক্ষমাপ্রার্থনা ভবানীপুরের গুজরাটি ভোটারদের মন কতটা গলাতে পারে এবং ব্যালট বাক্সে এর কী প্রভাব পড়ে।