প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-দিনটা ছিল তেসরা অক্টোবর, ২০০৮। গভীর রাতে সিঙ্গুর ছেড়ে চলে গিয়েছিল ন্যানো। বিদায় নিয়েছিল টাটা। আর তার ঠিক ১৮ বছর পর, ২০২৬-এর মে মাসে মহাকরণ-নবান্নের অলিন্দ থেকে বিদায় নিয়েছে সেই দেড় দশকের পুরনো জমানা। আজ, ১০ জুন, নবগঠিত মন্ত্রিসভার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে চেয়ারে বসেই তাপস রায় যে হুঙ্কারটা দিলেন, তাতে আক্ষরিক অর্থেই তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে রাজ্য রাজনীতিতে। সরাসরি ঘোষণা—”বাংলায় টাটাকে ফেরানোই আমার সরকারের এক নম্বর লক্ষ্য।”প্রশ্নটা আজ আর নিছক কোনো গাড়ির কারখানার নয়। প্রশ্নটা এই রাজ্যের কোটি কোটি বেকার যুবকের আত্মসম্মানের। আজ দায়িত্ব নিয়েই নতুন শিল্পমন্ত্রী যেন এক লহমায় ওলটপালট করে দিলেন বিগত দেড় দশকের চেনা রাজনৈতিক ন্যারেটিভকে। যে টাটা-বিতাড়নকে একদা ‘ঐতিহাসিক জয়’ বলে ঢাক পেটানো হয়েছিল, আজ যেন সেই জমানার ভ্রান্ত সরকারি নীতির বিরুদ্ধেই সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন নতুন শিল্পমন্ত্রী।

আজ সাংবাদিক বৈঠকে বসে নতুন শিল্পমন্ত্রী যেভাবে পূর্বতন জমানাকে নিশানা করলেন, তা এক কথায় নজিরবিহীন। তবে তাঁর এই আক্রমণের পেছনে রয়েছে অকাট্য যুক্তি। জনতা আজ জানতে চাইছে—বিগত দেড় দশকে বাংলার বুকে কোন বড় শিল্পটা এসেছে? যে সিঙ্গুর আন্দোলনের ওপর ভর করে ক্ষমতা দখল হয়েছিল, সেই সিঙ্গুরের জমিতে আজ কি সর্ষে ক্ষেত ছাড়া আর কিছু মেলেনি? কেন টাটাদের চলে যাওয়ার পর বাংলার কয়েক প্রজন্মের যুবসমাজকে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে গতর খাটাতে হলো? কেন গুজরাটের সানন্দ টাটার হাত ধরে গাড়ি শিল্পের হাব হয়ে উঠল, আর বাংলা পড়ে রইল কেবলই প্রতিশ্রুতির মরীচিকায়? আজ নতুন মন্ত্রী তথ্য দিয়ে দাবি করেছেন, কেবল টাটা গোষ্ঠীই নয়, পূর্বতন জমানার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রতিকূল পরিবেশ আর ভ্রান্ত অর্থনৈতিক নীতির কারণে গত কয়েক বছরে ৬৫০০-র বেশি ছোট-বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা এই রাজ্য ছেড়ে ভিন রাজ্যে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে! একটা রাজ্যকে কীভাবে শিল্পের বধ্যভূমিতে পরিণত করা যায়, বিগত জমানার নীতি কি তারই জ্বলন্ত প্রমাণ নয়? আজ এই প্রশ্নই তুলেছে নতুন সরকার।টাটা মোটরসের সেই সিঙ্গুর প্রকল্প বাতিলের কারণে হওয়া বিশাল আর্থিক ক্ষতির জন্য যে আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল রাজ্য সরকারকে কয়েকশো কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল, তা আজ প্রমাণিত সত্য। ফলে বিগত সরকারের জেদের মাশুল যে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় গুনতে হয়েছে, তা আজ আর গোপন নয়।

তবে শুধু টাটাদের আমন্ত্রণ জানানো বা বিগত জমানার ব্যর্থতাকে ধুয়ে দেওয়াই কি শেষ কথা? নাকি শুভেন্দু অধিকারীর নতুন মন্ত্রিসভার পেছনে রয়েছে কোনো সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট? যে অবিশ্বাস আর লাল ফিতের ফাঁস বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাকে মুড়ে রেখেছিল, তা রাতারাতি ছিঁড়ে ফেলা কি আদেও সম্ভব? পরিযায়ী শ্রমিক হওয়া বাংলার যুবকেরা কি সত্যিই এবার ঘরের মাঠে কাজ পাবে? নাকি টাটাদের এই ইস্যুও কালের নিয়মে কেবলই এক রাজনৈতিক হেডলাইনের দলিল হয়ে থেকে যাবে? উত্তর দেবে সময়। নজর থাকবে আমাদের।