প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ক্ষমতা চলে গেলেও কি স্বভাব বদলায়? নাকি দুর্নীতির শিকড় এতটাই গভীরে যে, তার অবশিষ্টাংশ এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে? উত্তর চব্বিশ পরগনার বাগুইআটিতে রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়িকা অদিতি মুন্সির বন্ধ দলীয় কার্যালয়ের তালা ভাঙতেই যে দৃশ্য সামনে এল, তা দেখে চক্ষু চড়কগাছ রাজনৈতিক মহলের। যে ত্রাণসামগ্রী এতদিন সাধারণ মানুষের ঘরে থাকার কথা ছিল, তা ধুলো মাখছিল এই বন্ধ ঘরের অন্ধকারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের একবার জোড়াফুল শিবিরের সততা নিয়ে উঠছে তীব্র এবং ঝাঁঝালো প্রশ্ন।
বাগুইআটি এলাকার ওই পার্টি অফিসটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেখানে সশরীরে হাজির হন এলাকার বর্তমান বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। সঙ্গে ছিল পুলিশ প্রশাসন। কোনো লুকোছাপা নয়, একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশকে সাক্ষী রেখে ইটের আঘাতে ভাঙা হয় বন্ধ ঘরের তালা। আর দরজা খুলতেই যা দেখা গেল, তাকে এককথায় ‘লুটের মালখানা’ বললেও হয়তো কম বলা হয়।
সরকারি সিলমোহর দেওয়া ত্রাণের পাহাড় থেকে শুরু করে ভোটের কাগজ— তালিকায় কী নেই! থরে থরে সাজানো রয়েছে বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রিপল, শাড়ি, সাদা কাপড় এবং ছাতা। দুর্যোগে সাধারণ মানুষের মাথার উপর যে ত্রিপল ছাদ হওয়ার কথা ছিল, তা এখানে ঘরের কোণে বন্দি ছিল। শুধু ত্রাণেই শেষ নয়। ঘর থেকে উদ্ধার হয়েছে নির্বাচন বা ভোট সংক্রান্ত বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নথিপত্র। ভোট প্রক্রিয়ার কী ধরনের গোপন খতিয়ান এই বন্ধ কার্যালয়ে মজুত করার প্রয়োজন হয়েছিল, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রহস্য দানা বাঁধছে।
অদিতি মুন্সির কার্যালয়ের ঠিক পাশেই রয়েছে তাঁর স্বামী তথা দাপুটে নেতা দেবরাজ চক্রবর্তীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বিধাননগর পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুর প্রতিনিধি ইন্দ্রনাথ বাগুইয়ের কার্যালয়। তদন্তের খাতিরে সেই ঘরেও তল্লাশি চালানো হয়। আর সেখান থেকেই উদ্ধার হয়েছে বেশ কিছু কাটারি জাতীয় ধারালো অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক নথির বান্ডিল। রাজনীতির আখড়ায় কেন এই পরিমাণ ধারালো অস্ত্র মজুত রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
যেহেতু পুরো অভিযানটি পুলিশের সামনেই পরিচালিত হয়েছে এবং সমস্ত উদ্ধার হওয়া সামগ্রী আইন মোতাবেক নথিবদ্ধ করা হচ্ছে, তাই একে কোনোভাবেই ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এই বিষয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বর্তমান বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি সাফ জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় কেনা সরকারি ত্রাণসামগ্রী এভাবে দলীয় অফিসে মজুত করে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং চরম অপরাধ। জনগণের সম্পত্তি কেন সাধারণের মধ্যে বণ্টন না করে আড়াল করে রাখা হলো, তার জবাবদিহি দলটিকে করতেই হবে। ক্ষমতার আস্ফালন শেষ হলেও এই দলের নেতাদের একাংশের ঘরের ভেতরে যে এখনো দুর্নীতির বীজ লুকিয়ে রয়েছে, বাগুইআটির এই ঘটনা তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। এই বিপুল পরিমাণ বেআইনি সামগ্রী উদ্ধারের পর এবার পুলিশ ও প্রশাসন দোষীদের বিরুদ্ধে কী আইনি পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার।