প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পূর্ব বর্ধমান এবং ঝাড়খণ্ড থেকে গ্রেফতারের পর্ব শেষ হওয়ার পর, এবার আন্তর্জাতিক জঙ্গি জালের শিকড় উপড়ে ফেলতে চূড়ান্ত অ্যাকশনে নামল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা NIA (National Investigation Agency)। জইশ-ই-মহম্মদ (JeM) জঙ্গি মডিউলের মূল পাণ্ডা হামিম মণ্ডল এবং তাঁর প্রেমিকা তথা সহযোগী অর্পিতা সরকারকে হেফাজতে নেওয়ার পর, কলকাতার বেঙ্গল STF (Special Task Force) সদর দফতরে মুখোমুখি বসিয়ে শুরু হয়েছে হাইপ্রোফাইল ম্যারাথন জেরা। ধৃতদের বিরুদ্ধে কঠোর UAPA (বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন) ধারায় মামলা রুজু হওয়ার পর, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য গোয়েন্দাদের এই যৌথ জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক তথ্য ডিকোড করা সম্ভব হয়েছে।

তদন্তকারী দল সূত্রে জানা গেছে, ধৃত হামিম মণ্ডলকে পাকিস্তান থেকে হ্যান্ডলাররা নির্দেশ দিয়েছিল এদেশের পুলিশ ইউনিফর্ম বা খাকি পোশাক জোগাড় করার জন্য। সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা পড়ুয়াদের আন্দোলনের (Student Protest) সুযোগ নিয়ে একদল উগ্রপন্থী যুবক-যুবতীকে নিয়ে সেখানে ঢুকে বড়সড় বিশৃঙ্খলা ও পুলিশ সেজে নাশকতার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছিল এই জঙ্গি মডিউল। এনআইএ মূলত এই দিল্লির চক্রান্তের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখছে। জিজ্ঞাসাবাদে সবচেয়ে সংবেদনশীল যে তথ্যটি ভেরিফাই করা হয়েছে তা হলো, পাকিস্তানের আইএসআই (ISI) সমর্থিত হ্যান্ডলাররা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিরাপত্তা বলয় ও তাঁর যাতায়াতের রুট ট্র্যাক করার নির্দেশ দিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী কখন কোন এলাকায় সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় (Unguarded movements) থাকেন বা তাঁর কনভয়ের নিরাপত্তা ফাঁক কোথায়, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ রেকি করে পাকিস্তানে রিপোর্ট পাঠানোর দায়িত্বে ছিল হামিম, যা জেরায় স্বীকার করেছে সে। ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থেকে ধৃত ২২ বছর বয়সী অর্পিতা সরকার মূলত একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, যার ইনস্টাগ্রাম রিল ও বাইক রাইডিংয়ের আড়ালে চলত দেশবিরোধী কাজ। এনআইএ-র সাইবার উইং অর্পিতার ডিভাইস পরীক্ষা করে জানতে পেরেছে, সে হোয়াটসঅ্যাপ ও সুরক্ষিত ক্রিপ্টো অ্যাপের মাধ্যমে পাকিস্তানের ‘আবির জাট৩৩৩’, ‘উজাইর’, ‘রানা’ এবং ‘হামাদ’ নামক ৪টি কুখ্যাত হ্যান্ডলারের সাথে যুক্ত ছিল। এই হ্যান্ডলাররা পাকিস্তানের কুখ্যাত ‘শাহজাদ ভাট্টি গ্যাং’-এর সদস্য, যারা মূলত ব্রিটেন এবং মেক্সিকোর আন্তর্জাতিক সিম কার্ড ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক চালাত। সাধারণ নজরদারি এড়াতে এরা কোনও সাধারণ কল বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করত না (কেবল অর্পিতার সাথে যোগাযোগের প্রাথমিক মাধ্যম ছাড়া)। পাকিস্তান হ্যান্ডলারদের সাথে সংবেদনশীল তথ্য আদানপ্রদানের জন্য তারা ২০২৩ সালে ভারত সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত এনক্রিপ্টেড ক্রিপ্টো চ্যাটিং অ্যাপ ‘Element X’ ব্যবহার করত। এই অ্যাপে ব্যবহারকারীদের একটি ইউনিক আইডি থাকে, যেখানে শাহজাদ ভাট্টি গ্যাংয়ের সদস্যরা ‘333’ ইউজার আইডি ব্যবহার করত—যা শাহজাদ-এর টিকটক ইউজার নেম থেকে নেওয়া বলে জেরায় উঠে এসেছে।তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, অর্পিতা তাঁর রূপের জালে বাংলার একাধিক প্রভাবশালী বিজেপি নেতা, আমলা ও উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছিল। এমনকি রাজ্যের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছেলেকে ‘হানিট্র্যাপ’ করে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তীতে বড়সড় অপহরণ করে কোটি কোটি টাকা আদায়ের (Terror Funding) ছক কষেছিল এই যুগল, যা এনআইএ-র জিজ্ঞাসাবাদের পর সম্পূর্ণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

বর্তমানে ধৃত দু’জনকেই কঠোর সুরক্ষায় রেখে যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে। তাঁদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া একাধিক আন্তর্জাতিক সিম কার্ড, ল্যাপটপ এবং এনক্রিপ্টেড চ্যাট ডিকোড করতে সেগুলিকে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। কাশ্মীর মডিউলের সাজ্জাদ ভাটের সাথে এদের সংযোগের সত্যতা এবং অর্থায়নের উৎস (Narco-Terror) নিশ্চিত করতেই এখন এনআইএ ও এসটিএফ যৌথভাবে তদন্তের জাল গোটাচ্ছে।