প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাংলার রাজনীতিতে নির্বাচনের দামামা বাজলেই শুরু হয় এক অদ্ভুত তরজা। আর সেই তরজার কেন্দ্রে বরাবরই থাকে ‘ভোট কাটাকাটি’ এবং ‘বিজেপির বি-টিম’ তকমা। এতদিন এই তকমা বাম-কংগ্রেস বা নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ-এর ওপর সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করত তৃণমূল কংগ্রেস। তবে এবার সেই তালিকায় নবতম সংযোজন এআইএমআইএম (AIMIM) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি এবং বিক্ষুব্ধ নেতা হুমায়ুন কবীর। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে, সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে এই দলগুলিকে টাকা দিয়ে নামানো হয়েছে। আর এই চেনা অভিযোগের পাহাড় নিয়ে এবার সরাসরি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেনজির আক্রমণ শানালেন হায়দ্রাবাদের সাংসদ।
তৃণমূল শিবিরের দীর্ঘদিনের দাবি, রাজ্যে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক তাদের একচেটিয়া সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হুমায়ুন কবীরের মত নেতাদের বিদ্রোহী মনোভাব এবং মিম-এর সক্রিয়তা জোড়াফুল শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযোগ, এই নেতাদের পেছনে বিজেপি বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে যাতে তৃণমূলের নিশ্চিত ভোটব্যাঙ্কে ধস নামানো যায়। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন জনসভায় দাবি করেছেন যে, বিজেপি টাকা দিয়ে এই ছোট ছোট দলগুলিকে ‘লেলিয়ে’ দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য একটাই— বিরোধী ভোট ভাগ করে গেরুয়া শিবিরের জয়ের পথ প্রশস্ত করা।
এই ‘বিজেপির থেকে টাকা নেওয়া’র অভিযোগ নিয়ে গতকাল মন্তব্য করেছিলেন আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। প্রশ্নটি শোনামাত্রই তিনি মেজাজ হারান এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। ওয়েইসি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, “তৃণমূল বলছে আমি বিজেপির থেকে টাকা নিয়েছি? তাই যদি হয়, তাহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই টাকার ৯০ শতাংশ দিয়ে দিতে প্রস্তুত আমি। বাকি ৫ শতাংশ আমি নিজে রাখছি, আর ৫ শতাংশ দিয়ে দিচ্ছি ভাই হুমায়ুনকে। এবার বলুন!”
ওয়েইসির এই মন্তব্য আসলে তৃণমূলের তোলা অভিযোগকে বিদ্রূপের ছলে নস্যাৎ করে দেওয়া। রাজনৈতিক মহলের মতে, ওয়েইসি বোঝাতে চেয়েছেন যে তৃণমূলের কাছে কোনো গঠনমূলক ইস্যু নেই, তাই তারা বারবার ধর্মীয় মেরুকরণ এবং মিথ্যে অপপ্রচারের আশ্রয় নিচ্ছে। সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম নিয়ে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা বলে তিনি একপ্রকার বোঝাতে চেয়েছেন যে, তৃণমূলের অভিযোগগুলো কতটা ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর।
গেরুয়া শিবিরের দাবি, তৃণমূল আসলে সাধারণ মানুষের সমর্থন হারিয়ে এখন সব জায়গায় ভূত দেখছে। তাদের নিজের পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে বলেই তারা মিম বা হুমায়ুন কবীরের মত নেতাদের দিকে আঙুল তুলছে। বিজেপি নেতাদের মতে, তৃণমূলের এই ‘বিজেপি-ভীতি’ আসলে তাদের পরাজয়ের আগাম সংকেত। জনসমর্থন হারিয়ে এখন ধর্মীয় তাস খেলে পার পেতে চাইছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা, যা বাংলার সচেতন ভোটাররা ধরে ফেলেছেন।
ওয়েইসির এই ৯০ শতাংশের ‘অফার’ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। নেটিজেনরা বলছেন, দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ তৃণমূল নেতাদের জন্য এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক বিদ্রূপ আর হতে পারে না। যেখানে শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীদের ঘর থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধারের ঘটনা মানুষের স্মৃতিতে টাটকা, সেখানে ওয়েইসি পাল্টা টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে একপ্রকার মানসিক চাপে ফেলে দিয়েছেন জোড়াফুল শিবিরকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই ধরণের বাদানুবাদ নির্বাচনের আগে মেরুকরণের রাজনীতিকে আরও তীব্র করবে। তৃণমূলের চেনা ছক— অর্থাৎ ‘বিজেপির ভয় দেখানো’— এবার আর কাজ করছে না বলেই বিরোধীদের ধারণা। তবে আসাদউদ্দিন ওয়েইসির এই সরাসরি আক্রমণ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ইমেজকে কতটা ধাক্কা দেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আপাতত ওয়েইসির এই ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।