প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাংলায় ভোট মানেই কি বাহুবল? নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ কি তবে শুধুই কাগজের বাঘ? গত মঙ্গলবার রাতে কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO)-এর দফতরের সামনে যা ঘটল, তা দেখে সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্নগুলোই জোরালো হচ্ছে। যেখানে খোদ কমিশনের সদর দফতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারা (প্রাক্তন ১৪৪ ধারা) জারি ছিল, সেখানে রাতের অন্ধকারে একদল জমায়েতকারীর ‘তাণ্ডব’ দেখে শিউরে উঠেছে শহরবাসী। আর এই পুরো বিশৃঙ্খলার মূলে যে নামগুলো উঠে আসছে, তাঁরা শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের দুই দাপুটে কাউন্সিলর। লালবাজার ইতিমধ্যেই তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপের পথে হেঁটেছে।
লালবাজারের পক্ষ থেকে কলকাতা পুরসভার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শান্তিরঞ্জন কুন্ডু এবং ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শচীন সিংহ-কে কড়া নোটিস পাঠানো হয়েছে। সূত্রের খবর, তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৩২ নম্বর ধারা, যা সরকারি কর্মচারীকে কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার মত গুরুতর এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ, সেই ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। হেয়ার স্ট্রিট থানায় দায়ের হওয়া এই মামলায় অভিযুক্তদের আগামী তিন দিনের মধ্যে সশরীরে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। শুধু এই দুই কাউন্সিলরই নন, তালিকায় নাম রয়েছে মহম্মদ ওয়াসিম, মইদুল, চন্দ্রকান্ত সিংহ এবং মহম্মদ রিজ়ওয়ান আলির মতো ব্যক্তিদেরও।
মঙ্গলবার রাতটা যেন ছিল আইনের শাসনের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার মহড়া। ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা ফর্ম-৬ জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে বচসার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ, পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যায় যখন একদল জমায়েতকারী ১৬৩ ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিইও দফতরের সামনে জড়ো হন। সিইও মনোজ আগরওয়ালকে লক্ষ্য করে কুরুচিকর ও উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয় এবং নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের রীতিমত ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। প্রশ্ন উঠছে, পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কীভাবে এই জমায়েত সম্ভব হলো? এটি কি নিছকই বিক্ষোভ, নাকি কমিশনকে চাপে রাখার এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা?
ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ধরণের ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকদের ভয় দেখানো কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা এবং কমিশনের কঠোর নজরদারিতে কোণঠাসা হয়েই কি তবে শাসক শিবির এই ধরণের ‘রাতের অন্ধকার’ রাজনীতি বেছে নিচ্ছে? বিরোধীদের অভিযোগ, বুথ দখল বা ছাপ্পা ভোটের পথ যখন বন্ধ হয়ে আসছে, তখন কমিশনকে বিঁধে জনমানসে এক ধরণের ভীতি ও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তৃণমূলের অন্দরে এখন এই নোটিস ঘিরে অস্বস্তির হাওয়া। যেখানে নির্বাচনের আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর রয়েছে, সেখানে আইনের প্রহরীদের নাকের ডগায় আইন ভাঙার এই স্পর্ধা দেখে অবাক অনেকেই। লালবাজারের তলবে সাড়া দিয়ে ওই দুই কাউন্সিলর থানায় হাজিরা দেন নাকি আইনি রক্ষাকবচ খুঁজতে আদালতের দ্বারস্থ হন, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, সিইও দফতরের সামনে সেই রাতের ঘটনা বাংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক কঙ্কালসার চেহারাকেই ফের একবার জনসমক্ষে এনে দিল।