প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সরকারি হাসপাতালের নাকের ডগায় বসে দিনের পর দিন ধরে চলছিল ভুয়ো জন্ম সার্টিফিকেট তৈরির এক মস্ত বড় আন্তর্জাতিক র‍্যাকেট? ১৯৯৯ সালের ধুলো জমা পুরনো লকবুক খুলতেই যা বেরিয়ে এলো, তাতে রীতিমতো থমকে গিয়েছেন তদন্তকারীরা! আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে জাল জন্ম সার্টিফিকেট চক্রের এই চাঞ্চল্যকর পর্দাফাঁস ঘিরে এখন উত্তরবঙ্গ জুড়ে তীব্র তোলপাড়। এই মারাত্মক দুর্নীতির নেপথ্যে খোদ হাসপাতালের সহকারী সুপারের (Assistant Superintendent) নাম জড়িয়ে পড়ায় ঘটনার মোড় নিয়েছে এক চরম প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির দিকে! ঘটনার গুরুত্ব বুঝে আলিপুরদুয়ার থানায় সরাসরি এফআইআর (FIR) দায়ের করেছেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক পরিতোষ দাস। তদন্তে নেমে পুলিশ হাসপাতালের ১৯৯৯ সালের মূল লকবুকটি ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করেছে।

অভিযোগের সূত্রপাত বেশ কিছুদিন আগেই। ভুয়ো নথির ভিত্তিতে একের পর এক ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট তৈরির চক্রের খোঁজে তল্লাশি চালাতে গিয়েই আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের নাম সামনে আসে। সন্দেহ হওয়ায় হাসপাতালের ১৯৯৯ সালের ডেলিভারি ও বার্থ লকবুকটি বের করে যখন উচ্চপর্যায়ের তথ্য যাচাই (Verification) শুরু হয়, তখনই আসল সত্যটা সামনে আসে। দেখা যায়, লকবুকের বহু জায়গায় মারাত্মক অসঙ্গতি রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রমাণ—একই ব্যক্তির নামের পাশে এবং একই তারিখে দুই ধরনের আলাদা আলাদা হাতের লেখা (Double Handwriting) স্পষ্ট ধরা পড়েছে! অর্থাৎ, পুরনো রেকর্ডের ফাঁকা জায়গায় বা নাম মুছে নতুন করে অন্য হাতের লেখায় ভুয়ো নাম-ঠিকানা বসিয়ে এই জাল সার্টিফিকেটগুলি ইস্যু করা হচ্ছিল মোটা টাকার বিনিময়ে।

এই জাল চক্রের পর্দাফাঁস হতেই হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী সুপারের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বিজেপি বিধায়ক পরিতোষ দাসের স্পষ্ট অভিযোগ, এই চক্রের বিষয়ে সহকারী সুপারকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর তো দিতেই পারেননি, উল্টে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হাসপাতাল প্রশাসনের এই চরম উদাসীনতা ও যোগসাজশের বিরুদ্ধেই এবার সোচ্চার হয়েছেন বিধায়ক।

থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেনি পুলিশ। হাসপাতালের অন্দরে তল্লাশি চালিয়ে ১৯৯৯ সালের সেই বিতর্কিত লকবুকটি নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে আলিপুরদুয়ার থানার পুলিশ। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এই লকবুকের হাতের লেখা ও কালির পরীক্ষা করানো হতে পারে বলে সূত্রের খবর।

উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলাটি বাংলাদেশ, ভুটান এবং অসমের সীমান্তের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত হওয়ায় এই জাল জন্ম সার্টিফিকেট চক্রকে স্রেফ কোনো সাধারণ আর্থিক জালিয়াতি হিসেবে দেখছেন না গোয়েন্দারা। ভুয়ো বার্থ সার্টিফিকেটের ওপর ভিত্তি করে অনুপ্রবেশকারীরা আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা পাসপোর্ট বানিয়ে দেশের মূল ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ছে কি না—সেই মারাত্মক দেশবিরোধী কোণটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। হাসপাতালের ভেতরের কোন কোন বড় মাথা এই চক্রের পেছনে রয়েছে এবং কোটি কোটি টাকার এই চক্রের জল কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার। আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের এই স্ক্যামের পর উত্তরবঙ্গের অন্যান্য হাসপাতালেও কি এবার বসবে তদন্তের নজরদারি? সময় কিন্তু সেই দিকেই এগোচ্ছে।