প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-মে ২০২৬-এর ঐতিহাসিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী যখন প্রশাসনিক রাশ শক্ত করছেন, ঠিক তখনই এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে রাজ্যে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের কোপে তৃণমূলের প্রতীক ফ্রিজ হওয়া, অন্যদিকে একের পর এক দলত্যাগ ও আইনি গেরোয় বিরোধী শিবির যখন কার্যত দিশেহারা, তখন বিজেপির অন্দরেই তৈরি হচ্ছে এক মনস্তাত্ত্বিক সংকট। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকদের মতে, বাইরে যখন কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বা সাধারণ শত্রু থাকে না, তখন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভাঙতে শুরু করে। আর এটাই এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তৃণমূল জমানার পতন ঘটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বঙ্গ বিজেপির অন্দরে ‘আদি বনাম নব্য’ কিংবা দিল্লির ঘনিষ্ঠ বনাম মাটির লড়াইয়ের সমীকরণটি রাজনৈতিক মহলে সুবিদিত। এতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো এককাট্টা ও আক্রমণাত্মক প্রতিপক্ষ ময়দানে সক্রিয় থাকায় নিজেদের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ-বিক্ষোভ ভুলে একতাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হচ্ছিলেন গেরুয়া শিবিরের সব স্তরের নেতাকর্মীরা। কারণ, সকলের সামনে একটাই লক্ষ্য ছিল—ক্ষমতা দখল। কিন্তু ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর মাঠ যখন ক্রমশ বিরোধী-শূন্য হয়ে পড়ছে, তখন সেই তাগিদ বা বাধ্যবাধকতা আর থাকছে না।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, তৃণমূল বা কংগ্রেসের মতো প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলি যদি মাঠ থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তবে বিজেপির ভেতরের এই সুপ্ত অসন্তোষ দাবানলের মতো জ্বলে উঠতে পারে। জেলা স্তরে ক্ষমতা বিস্তার, সরকারি পদ অলঙ্করণ, পুরসভা বা পঞ্চায়েতের টিকিট বণ্টন থেকে শুরু করে ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার জন্য দলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে কামড়াকামড়ি চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতিহাস সাক্ষী, অতীতে বামফ্রন্ট বা তৃণমূল কংগ্রেস যখনই রাজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছে, তখনই তাদের মূল ক্ষতি বিরোধীরা করতে পারেনি, করেছে তাদের নিজেদের দলের ভেতরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা অন্তর্ঘাত। বিরোধীহীনতার অলীক স্বস্তিতে মজে গিয়ে বিজেপি যদি নিজের ঘরের শৃঙ্খলা হারায়, তবে আগামী দিনে দলের ভেতরের এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহই শুভেন্দু সরকারের স্থায়িত্ব ও ভাবমূর্তিকে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে ফেলে দিতে পারে।
শুভেন্দু অধিকারী একজন অত্যন্ত পোড়খাওয়া এবং বাস্তববাদী জননেতা। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, একটি বড় দলকে এককাট্টা রাখতে গেলে বাইরে একজন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের উপস্থিতি কতটা জরুরি। তাই বিরোধী নিধনের রাজনীতিতে অতিরিক্ত মনোনিবেশ না করে, নিজের দলের ভেতরের বিভিন্ন শিবিরের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সুশাসনের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করাই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মাঠ সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেলে দলের ভেতরের অহংকার ও অভ্যন্তরীণ যুদ্ধকে সামাল দেওয়া যে কতটা কঠিন, তা শুভেন্দু অধিকারীর চেয়ে ভালো আর কে বোঝেন।