প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সোমবার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত সংযোগস্থল হাজরা মোড় কার্যত এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল। টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী, বিশিষ্ট অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারীর মনোনয়ন পেশকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাময়িক উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক সক্রিয়তায় সরগরম হয়ে উঠল এলাকা। ঠিক কী কারণে মাঝপথে বিরোধী প্রার্থীকে থমকে যেতে হলো এবং কেনই বা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন বিজেপি কর্মীরা, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
এদিন বালিগঞ্জ ও টালিগঞ্জ—এই দুই কেন্দ্রের হাই-ভোল্টেজ প্রার্থীদের মনোনয়ন পেশের সূচি ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বালিগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় যখন বিশাল অনুগামী নিয়ে হাজরা মোড় এলাকা অতিক্রম করছিলেন, তখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু উত্তেজনা ছড়ায় ঠিক এর পরেই, যখন টালিগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারী ওই একই পথ দিয়ে তাঁর গন্তব্যের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
বিজেপি শিবিরের দাবি, পাপিয়া অধিকারী যখন তাঁর সমর্থকদের নিয়ে এগোতে যান, তখনই পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে পথ পরিবর্তন বা অপেক্ষা করার অনুরোধ করা হয়। পুলিশের যুক্তি ছিল, নিরাপত্তার স্বার্থে এবং এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূল প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়ে এলাকা থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ‘সাময়িক বিরতি’র প্রয়োজন ছিল।
তবে প্রশাসনের এই যুক্তিতে মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। তাঁদের অভিযোগ, এটি একটি পরিকল্পিত বাধা। প্রার্থীর সঙ্গে থাকা কর্মীদের প্রশ্ন, “তৃণমূল প্রার্থী যখন কয়েক হাজার লোক নিয়ে অনায়াসে রাস্তা দিয়ে যেতে পারছেন, তখন বিজেপি প্রার্থীকে কেন একা যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে? আইনের কি দু’রকম ভাষা হয়?” এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই পুলিশের সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের ব্যাপক বাদানুবাদ এবং ধস্তাধস্তি শুরু হয়, যার ফলে হাজরা মোড় এলাকা বেশ কিছুক্ষণ থমকে যায়।
ঘটনা প্রসঙ্গে তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করে বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারী জানিয়েছেন, এই ধরণের আচরণ তাঁর সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপের সমান। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এক পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে আর বিরোধীদের ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে সময় নষ্ট করা হবে? তিনি আরও দাবি করেন যে, এই ধরণের পরিস্থিতি আসলে ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরির একটি চেষ্টা হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২ এপ্রিল শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পর্বেও এই হাজরা মোড়েই প্রবল বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। সেই ঘটনায় নিরাপত্তা গাফিলতির অভিযোগে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে চারজন পুলিশ আধিকারিককে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়েছে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আজকের এই চিত্র প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বারংবার একই স্থানে বিরোধী প্রার্থীদের বাধার মুখে পড়া নিছক কাকতালীয় নাও হতে পারে। বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে। তবে বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং ভিডিও ফুটেজ তাঁরা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে পাঠাতে চলেছেন। তাদের দাবি, শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনেই প্রশাসন বিরোধীদের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
প্রশাসনের পাল্টা দাবি, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আইনশৃঙ্খলার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে, হাজরা মোড়ের এই ঘটনা ২০২৬-এর নির্বাচনী লড়াইয়ের পারদকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। এখন দেখার, নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কোনো নতুন নির্দেশিকা জারি করে কিনা।