প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের নৃশংস ঘটনার পর, কেন তড়িঘড়ি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর সৎকার সম্পন্ন করা হয়েছিল? তথ্যপ্রমাণ চিরতরে নষ্ট করার পেছনে কি তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের কোনো বড়সড় ষড়যন্ত্র কাজ করছিল? কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের নজিরবিহীন নির্দেশের পর, সেই বহুচর্চিত পানিহাটি শ্মশানঘাটে এবার সরাসরি তদন্তে নামল সিবিআই (CBI)-এর বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল (SIT)। রাজ্য রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ক্ষমতা বদলের পর, আরজি কর কাণ্ডের ‘ফাইল’ নতুন করে খোলায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সেই ক্ষোভ ও বিচারের দাবিতে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ককে সরিয়ে পানিহাটির মানুষ বিপুল ভোটে বিধায়ক নির্বাচিত করেছেন নির্যাতিতা তরুণী চিকিৎসকের মা, বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথকে। নিজের মেয়ের খুনের বিচার এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্টকারীদের চিহ্নিত করার যে লড়াই তিনি শুরু করেছিলেন, সিবিআই-এর এই পুনঃতৎপরতায় তা এক নতুন মাত্রা পেল।
নির্যাতিতার তড়িঘড়ি সৎকার এবং ময়নাতদন্তের দিন শ্মশানের নথিপত্রে কারচুপি বা প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পানিহাটি শ্মশানে পৌঁছাল সিবিআই-এর ৩ সদস্যের ‘সিট’। আগামী ২৫ জুনের মধ্যে নির্যাতিতার রাতের খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে পানিহাটি শ্মশানে দাহকাজ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত—গোটা ঘটনাক্রমের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ময়নাতদন্তের দিন পরিবারের তরফে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি তোলার চেষ্টা করা হলেও, তৎকালীন পুলিশ ও এক প্রভাবশালী মহলের চাপে তড়িঘড়ি দাহ সম্পন্ন করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৯ আগস্টের ঘটনার পর থেকেই পানিহাটি শ্মশানঘাটের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছিল আন্দোলনকারী ও নিহতের পরিবার। ঘটনার দিন আরজি কর হাসপাতাল থেকে শুরু করে পানিহাটি শ্মশান—সর্বত্রই পানিহাটির তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষের উপস্থিতি এবং শ্মশান কর্মীদের ওপর দ্রুত সৎকার করার জন্য মৌখিক চাপ সৃষ্টির যে অভিযোগ উঠেছিল, তা নতুন করে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। মৃতার কোনো রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় না হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন তৃণমূল কাউন্সিলার সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় কেন ডেথ সার্টিফিকেটে অন্যতম স্বাক্ষরকারী হিসেবে সই করেছিলেন, তা নিয়ে সিবিআই ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের ওপর চাপ সৃষ্টির যে অভিযোগ উঠেছিল, তার যোগসূত্রও খোঁজা হচ্ছে। সাধারণত ময়নাতদন্তের পর দেহ সৎকারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে যে স্বাভাবিক সময় লাগে, সেদিন কোন অদৃশ্য প্রভাবে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শ্মশানের সমস্ত সরকারি ছাড়পত্র ও অনুমতি মিলে গিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে শ্মশানের লগবুক ও তৎকালীন কর্মীদের বয়ান মেলানো হচ্ছে।
বিজেপি তথা জাতীয়তাবাদী শিবিরের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, আরজি করের মূল ঘটনার পাশাপাশি তথ্যপ্রমাণ লোপাটের পেছনে তৎকালীন সরকারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক আড়াল (Institutional Cover-up) কাজ করেছিল। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ও নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর এই মামলার পুরনো ফাইলগুলি পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্যাতিতার নিজের মা আজ পানিহাটির বিধায়ক। ফলে পানিহাটি শ্মশানের এই তদন্ত প্রক্রিয়াকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দিতে আইনি ও প্রশাসনিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে। সিবিআই-এর এই তদন্তের রিপোর্টে তৎকালীন নবান্ন বা স্বাস্থ্য ভবনের কোন কোন শীর্ষকর্তার নির্দেশ কাজ করছিল, তা সামনে এলে রাজ্য রাজনীতিতে আরও বড়সড় ওলটপালট হতে পারে।