প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-শিক্ষক দিবসের পবিত্র মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক অভূতপূর্ব ও সংবেদনশীল মেজাজে ধরা দিলেন রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার কলকাতার নিউটাউনে বিদ্যালয় শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা দফতরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে গুরুদায়িত্বের এক গভীর আবেগ। বিগত দেড় দশকের শাসনকালে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার যে অবক্ষয় হয়েছে এবং তার পর শাসনভার হাতে নিয়ে গোটা পরিকাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলা যে কতটা কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং, তা মঞ্চ থেকে অকপটে স্বীকার করে নেন মুখ্যমন্ত্রী। নতুন সরকারের সামনে থাকা পাহাড়প্রমাণ প্রশাসনিক জটের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বহু জটিলতা, বহু বন্ধুর পথ পেরিয়ে চলতে হচ্ছে আমাদের।”
মুখ্যমন্ত্রী এদিন স্পষ্ট করে দেন যে, কেবল প্রশাসনিক রদবদলই তাঁর সরকারের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বাংলা যে একদা গোটা ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পথপ্রদর্শক ছিল, সেই গৌরবকে ফিরিয়ে আনাই বর্তমান প্রশাসনের মূল লড়াই। নতুন শিক্ষানীতি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের রূপরেখা টেনে তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন, “বাংলার দীর্ঘদিনের যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য-পরম্পরা রয়েছে, তা আমরা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করব।” রাজ্যের এই নতুন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিজেপি সরকার যে মূলত “সোনার বাংলা” (Golden Bengal) গড়ে তোলার লক্ষ্যেই কাজ করছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সেই সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
শিক্ষা দফতরকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার শপথ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “ভুল থেকেই মানুষ শিক্ষা নেয়, SSC-তে ৩ জন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শিক্ষক রয়েছেন।” নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ করতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের বোর্ডে রামকৃষ্ণ মিশনের শিক্ষকদের পাশাপাশি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (IIM) থেকে একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই স্বচ্ছতার বার্তা দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “IIM থেকেও এক জনকে নেওয়া হয়েছে, আমরা শিক্ষক নিয়োগ করে দেব।”
বক্তব্যের শেষ পর্বে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডক্টর সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন এবং বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের প্রাসঙ্গিকতা টেনে তিনি বলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিশা দিয়ে গিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন নারীশিক্ষার প্রসারে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে সব সংস্কার করে গিয়েছেন, আজও তা প্রাসঙ্গিক।”একই সাথে বর্তমান শিক্ষক সমাজকে মণীষীদের পদাঙ্ক অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রকৃত শিক্ষক কেমন হওয়া উচিত, উদাহরণ ডক্টর সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন। ব্রিটিশ শাসনকালে ডক্টর সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণনের লেখা লন্ডন গিয়েছিল এবং ইংরেজরা পর্যন্ত তাঁর লেখা পড়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণনের নামে চেয়ার রয়েছে।” সব মিলিয়ে, শিক্ষক দিবসের এই মেগা মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেমন একদিকে অতীতের শিক্ষা খাতের বিপুল জটিলতার কথা স্বীকার করে আবেগপ্রবণ হয়েছেন, তেমনই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে বাংলার হারানো গরিমা ফেরাতে তাঁর সরকার যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না।