প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
কয়লা পাচার মামলার তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই যেন রহস্যের জাল ঘনীভূত হচ্ছে কলকাতার আইপ্যাক (I-PAC) দফতরকে ঘিরে। এবার এই মামলার দুই অন্যতম স্তম্ভ— প্রতীক জৈন এবং ঋষি রাজ সিং-এর দিল্লি হাজিরা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্টে কোমর বেঁধে নামলো এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বুধবার দিল্লি হাইকোর্টে ইডির সওয়াল-জবাব কেবল একটি আইনি লড়াই রইল না, বরং তা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা এবং তদন্তে ‘প্রভাবশালী’ হস্তক্ষেপের এক বিস্ফোরক খতিয়ানে পরিণত হলো।
এদিন আদালতে ইডির পক্ষ থেকে অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু যা দাবি করেছেন, তা রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ইডির অভিযোগ, গত ৮ জানুয়ারি যখন আইপ্যাক দফতরে এবং প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চলছিল, তখন সেখানে সশরীরে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় এজেন্সির দাবি, খোদ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এমন উপস্থিতি তদন্তকারী আধিকারিকদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়। ইডির স্পষ্ট বার্তা—যেখানে মুখ্যমন্ত্রী নিজে তদন্তের মাঝপথে পৌঁছে যান, সেখানে তদন্তের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা অসম্ভব।
দিল্লি হাইকোর্টে ইডি হলফনামা দিয়ে দাবি করেছে যে, কলকাতায় সিবিআই বা ইডির দফতরগুলি তদন্তের জন্য আর ‘সেফ জোন’ নয়। অতীতে সিজিও কমপ্লেক্স বা নিজাম প্যালেসের বাইরে যে ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছে, তার রেশ টেনেই ইডি জানিয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ বা নথি সেখান থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা প্রবল। সেই কারণেই প্রতীক জৈন ও ঋষি রাজ সিং-কে কলকাতার বদলে দিল্লির সদর দফতরে এনে জেরা করতে অনড় কেন্দ্রীয় সংস্থা।
অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, সামনেই পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু নির্বাচন, তাই তাঁরা কৌশল রচনায় অত্যন্ত ব্যস্ত। তাঁরা ভিডিও কনফারেন্সের (VC) মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইডি এই প্রস্তাব নস্যাৎ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সির যুক্তি, কয়লা কেলেঙ্কারির মত কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্তে বহু স্পর্শকাতর ডিজিটাল প্রমাণ এবং হার্ডকপি দেখিয়ে জেরা করতে হয়। ভিডিও কনফারেন্সে এই সব নথি দেখালে তার গোপনীয়তা ফাঁস হওয়ার (Data Breach) চূড়ান্ত ঝুঁকি থাকে। ইডির মতে, তদন্তের সার্থকতা বজায় রাখতে অভিযুক্তদের চোখের সামনে বসিয়ে জেরা করা আবশ্যিক।
বিচারপতি অনুপ জয়রাম ভামবানি ইডির কাছে জানতে চেয়েছেন, পাঁচ বছর ধরে তদন্ত চললেও কেন এই মুহূর্তে তাঁদের জেরা করা জরুরি। ইডি সাফ জানিয়েছে, তদন্তের জট ছাড়াতে এখন এই দুই ‘মাস্টারমাইন্ড’-এর বয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ইডি খুব শীঘ্রই বিস্তারিত হলফনামা জমা দেবে। তবে এসভি রাজু ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী ২ এপ্রিলের পরেই প্রতীক জৈনকে দিল্লিতে হাজিরার জন্য চূড়ান্ত নোটিশ পাঠানো হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইপ্যাকের এই দুই কর্তাকে দিল্লিতে তলব করা আসলে তৃণমূলের অন্দরমহলের জন্য বড় ধাক্কা। যদি তাঁরা দিল্লিতে হাজিরা দেন, তবে তদন্তের জল কতদূর গড়ায় এবং কয়লা পাচারের টাকার ভাগ ঠিক কাদের কাছে পৌঁছেছে, সেই গোপন তথ্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা প্রবল। এখন দেখার, আইপ্যাকের এই দুই সেনাপতি দিল্লির ‘চক্রব্যূহ’ এড়াতে আর কী আইনি চাল চালেন।