প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-কলকাতার সদর কার্যালয়ে বড়সড় ধাক্কা লাগার পর, এবার কি দেশের রাজধানী দিল্লির হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক অলিন্দেও নতুন সংকটের মুখে পড়তে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস? রাজনৈতিক মহলে এখন এই একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিকের দিল্লির সরকারি বাংলো— যা এতদিন দিল্লির বুকে জোড়াফুল শিবিরের অন্তর্বর্তীকালীন ‘হেডকোয়ার্টার’ বা অলিখিত প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে তুমুল টানাপোড়েন। রাজনৈতিক অন্দরের খবর, সাংসদ পার্থ ভৌমিক নিজেই এখন দলীয় নেতৃত্ব তথা ‘ভাইপো’ শিবিরের কাজের ধরনের ওপর ক্ষুব্ধ। আর তার জেরেই নিজের নামে বরাদ্দ দিল্লির ওই ভিভিআইপি সরকারি বাংলোয় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় চালানো এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নিয়ে তিনি আপত্তি জানাতে পারেন বলে জোর জল্পনা তৈরি হয়েছে।
দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব কোনো স্থায়ী দলীয় ভবন বা বড় পরিকাঠামো নেই। ফলে, দিল্লির ২০, রাজেন্দ্র প্রসাদ রোডের যে রাজকীয় সরকারি বাংলোটি ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিকের নামে বরাদ্দ হয়েছিল, সেটিকে যৌথ সম্মতিতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। জাতীয় স্তরের যেকোনো বড় বৈঠক, প্রেস কনফারেন্স বা রণকৌশল ঠিক করার জন্য এই বাংলোটিই ছিল তৃণমূলের দিল্লির প্রধান ঠিকানা। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতেই ছবিটাও বদলে গেছে বলে সূত্রের দাবি। রাজনৈতিক মহলের খবর, পার্থ ভৌমিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন—যেহেতু বাংলোটি তাঁর ব্যক্তিগত নামে বরাদ্দ, তাই সেখানে দলের কোনো অফিস বা বাইরের রাজনৈতিক আনাগোনা তিনি আর রাখতে চান না। এর ফলে দিল্লির বুকেও কার্যত ঘরছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে জোড়াফুল শিবিরের, এমনটাই দাবি বিরোধীদের।
রাজনৈতিক মহলের দাবি, এই সংকট আচমকা আসেনি। লোকসভায় তৃণমূলের একঝাঁক সাংসদ এখন শীর্ষ নেতৃত্বের কড়া নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব লাইন নিতে শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠছে। এমনকি লোকসভার স্পিকারের দরজায় দরজায় ঘুরে তাঁরা পৃথক বসার ব্যবস্থার জন্য তদ্বির করছেন বলেও সূত্রের খবর। এর মাঝেই পদ্ম শিবিরের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এই ‘বেসুরো’ সাংসদদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে এখন ওপেন সিক্রেট বলে দাবি করা হচ্ছে। এই অসন্তুষ্ট গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পার্থ ভৌমিকের নাম নিয়ে জল্পনা চলছে। ফলে, যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এতদিন দিল্লির বুকে দলের রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে একাধিপত্য চালাচ্ছিলেন, তাঁর সেই দিল্লির সাজানো সাম্রাজ্য এখন বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার মুখে।
কলকাতায় ক্ষমতা হারানোর পর যারা ভেবেছিলেন দিল্লিতে বিকল্প অটল সাম্রাজ্য গড়ে তুলে জাতীয় স্তরে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখবেন, পার্থ ভৌমিকের এই একটিমাত্র ব্যক্তিগত চাল দিল্লির সেই শেষ আশ্রয়টুকুও কি এখন ধূলিসাৎ করতে চলেছে? দিল্লিতে বসে যারা একসময় বড় বড় হুঙ্কার দিতেন, আজ দলের সাংসদদের ওপর থেকে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ কতটা শিথিল, তা এই কার্যালয় হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। একটি স্বীকৃত দলের যদি দেশের রাজধানীতেই বসার কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকে, তবে আগামী দিনে দিল্লির রাজনীতিতে তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি কেবল একটি সরকারি বাংলো বা কার্যালয় হাতছাড়া হওয়া নয়। এটি আসলে দলের ভেতরের এক গভীর সাংগঠনিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। কলকাতায় ধাক্কা খাওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে ভাঙনের মুখে পড়েছে এবং সাংসদরা যেভাবে প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে অবাধ্যতা দেখাচ্ছেন, তাতে দিল্লির বুকে দলের রাশ যে আর আগের মতো সুসংহত নেই, তা এই ঘটনা থেকেই পরিষ্কার। আগামী দিনে দিল্লির এই ‘ঠিকানাহীন’ দশা ঢাকতে নেতৃত্ব নতুন কী কৌশল নেয়, এখন সেটাই দেখার।