প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বাংলার জনকল্যাণমূলক প্রকল্প কি এখন শাসকের ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার শেষ ‘অস্ত্র’? নাকি উন্নয়নের গালভরা বুলির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রশাসনিক দেউলিয়াপনা? পূর্ব বর্ধমানের মেমারি ১ নম্বর ব্লকের তৃণমূল মহিলা সভানেত্রী গীতা দাসের সাম্প্রতিক এক নিদান ঘিরে এখন এই প্রশ্নই আছড়ে পড়ছে রাজ্য রাজনীতির অন্দরে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পেতে হলে বাড়ির দেওয়াল থেকে মুছতে হবে বিরোধী শিবিরের প্রতীক— শাসক নেত্রীর এই ‘ফতোয়া’ কি কেবল এক বিচ্ছিন্ন হুঙ্কার, নাকি বাংলার গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক?

সম্প্রতি মেমারিতে তৃণমূল প্রার্থী রাসবিহারী হালদারের সমর্থনে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মেমারি ১ নম্বর ব্লকের তৃণমূল মহিলা সভানেত্রী গীতা দাস এক নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে (যার সত্যতা আমাদের পোর্টাল যাচাই করেনি) তাঁকে বলতে শোনা যায়, “যাদের বাড়ির দেওয়ালে পদ্মফুল আঁকা থাকবে, তাদের বাড়ির লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ করে দেওয়া হবে।” নেত্রীর সাফ কথা, সরকারি প্রকল্পের মাসিক ভাতা পকেটে পুরতে হলে বাড়ির দেওয়াল থেকে বিরোধী শিবিরের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে হবে। অর্থাৎ, পেটের টানে এখন রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিতে হবে সাধারণ মানুষকে— এটাই কি তবে ‘নতুন তৃণমূলের’ প্রচ্ছন্ন বার্তা?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের মন্তব্য আসলে এক গভীর রাজনৈতিক হীনম্মন্যতার বহিঃপ্রকাশ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা এই জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের পারিবারিক ট্রাস্ট বা ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পরিচালিত হয় না। এগুলি সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রমের কর (Tax)-এর টাকায় চলে। ফলে, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া কেবল অনৈতিকই নয়, বরং সরাসরি সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের (সাম্যের অধিকার) পরিপন্থী। প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূল কি তবে উন্নয়নের নিরিখে ভোট চাইতে ভয় পাচ্ছে? যদি উন্নয়নই হয়ে থাকে তুরুপের তাস, তবে কেন ‘ভয়’ এবং ‘হুমকি’র রাজনীতিকে সামনে আনতে হচ্ছে? বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পায়ের তলার মাটি আলগা হওয়ার আশঙ্কাই শাসক শিবিরের নেতাদের দিয়ে এমন কুরুচিকর এবং অগণতান্ত্রিক মন্তব্য করিয়ে নিচ্ছে।

গণতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রতিটি নাগরিকের অধিকার আছে নিজের পছন্দমতো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার। বাড়ির দেওয়াল বা অন্দরমহল— সেখানে কোন দলের পতাকা বা প্রতীক থাকবে, তা সম্পূর্ণভাবে সেই পরিবারের ব্যক্তিগত পরিসর। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত পরিসরে সরকারি ভাতার দোহাই দিয়ে হস্তক্ষেপ করা কার্যত ‘রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’-এর নামান্তর। বিরোধীদের দাবি, গরিব মানুষের ‘অসহায়ত্ব’কে মূলধন করে ক্ষমতার দহরম-পহরম দেখানোই এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে শাসক দলের একাংশের।

যদি সত্যিই রাজনৈতিক কারণে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ করা হয়, তবে তা রাজ্য প্রশাসনে এক বড় ধরণের সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। বিজেপি ইতিমধ্য়েই এই বিষয়টিকে নির্বাচন কমিশনের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, ভোটারদের ভয় দেখিয়ে এবং প্রভাবিত করার চেষ্টা করে তৃণমূল অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে।এখন দেখার, এই ‘বেফাঁস’ মন্তব্য নিয়ে তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্ব কোনো কড়া পদক্ষেপ নেয় কি না, নাকি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বন্ধের এই পরোক্ষ হুমকি সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের পরিবর্তে শাসক বিরোধী বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে। বাংলার সচেতন ভোটাররা কি এই ‘ফতোয়া’ মুখ বুজে সহ্য করবেন, নাকি ব্যালট বক্সেই দেবেন এর যোগ্য জবাব? সময় তার উত্তর দেবে।