প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
ভোটের মুখে পায়ের তলার মাটি সরলে মানুষ যে কতটা দিশেহারা হতে পারে, সোমবার পাঁশকুড়ার নির্বাচনী জনসভা যেন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে রইল। রাজ্যে শিল্প নেই, কলকারখানা নেই, শিক্ষিত যুবকদের জন্য চাকরি নেই— আছে শুধু দুর্নীতির পাহাড় আর নিয়োগ কেলেঙ্কারির কালি। আর এই সব জ্বলন্ত ইস্যু থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধরলেন ‘ভয়ের রাজনীতি’র তাস। এদিন পাঁশকুড়া থেকে তিনি যা দাবি করলেন, তা শুনে রাজনৈতিক মহলের হাসাহাসি থামছে না। জনৈক ভোটারের কথায়, “দিদি কি এবার আমাদের রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে ভোট চাইবেন?”
পাঁশকুড়ার সভা থেকে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক অদ্ভুত এবং ভিত্তিহীন আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রতিটা সিট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটা সিটে যদি হারি তাহলে সেই সিটটা নিয়ে বিজেপি আপনার মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবে। আপনার মাংস খাওয়া বন্ধ করবে, আপনার কথা বলা বন্ধ করবে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নের খতিয়ান দেওয়ার মত আর কিছু অবশিষ্ট নেই বলেই এখন মানুষের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ‘খাদ্য-ভীতি’র তত্ত্বকে নস্যাৎ করে দিয়ে বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব পাল্টা আক্রমণের পথে হেঁটেছে। বিজেপির এক শীর্ষ নেতার দাবি, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভুলে গিয়েছেন যে উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক বিজেপি শাসিত রাজ্যে মানুষ নিশ্চিন্তে মাছ-মাংস খাচ্ছেন। বিজেপি মানুষের পাতে হস্তক্ষেপ করে না, বরং মানুষের পাতে যাতে অন্ন জোটে তার ব্যবস্থা করে। দিদি বরং উত্তর দিন— কেন তাঁর জমানায় মিড-ডে মিলের খাবারে সাপ আর টিকটিকি পাওয়া যায়? কেন বাংলার মানুষ আজ দু-বেলা ঠিকমতো খেতে পারছে না?”
তৃণমূল জমানার গত এক দশকের ইতিহাস বলছে, যখনই কোনো বড় দুর্নীতি সামনে আসে, তখনই মুখ্যমন্ত্রী এমন কিছু আবেগপ্রবণ বা অবাস্তব মন্তব্য করেন যা নিয়ে চর্চা শুরু হয়। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন কেলেঙ্কারি— সব জায়গাতেই যখন ঘাসফুল শিবিরের মুখ পুড়ছে, তখন ‘মাছ-মাংস’ কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কি খড়কুটো আঁকড়ে ধরার শেষ চেষ্টা? পাঁশকুড়ার সভায় ভিড়ের মধ্যে থেকেও ফিসফাস শোনা গিয়েছে— “চাকরি তো কেড়ে নিয়েছেন বাবুরা, এবার কি মাছ-মাংসের ভয় দেখিয়ে ভোটটা নেবেন?”
মেদিনীপুরের মাটিতে বিজেপির ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে যে নবান্নের অন্দরে কাঁপুনি ধরেছে, তা আজ মমতার কথাতেই স্পষ্ট। ইস্যুভিত্তিক লড়াইয়ে এঁটে উঠতে না পেরে এখন ধর্মীয় বিভাজন বা ব্যক্তিগত অভ্যাসের দোহাই দিয়ে ভোটব্যাঙ্ক সংহত করার পুরনো কৌশল নিচ্ছেন তিনি। কিন্তু ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা জানেন, বাকস্বাধীনতা হরণ যদি কোথাও হয়ে থাকে, তবে তা এই বাংলাতেই হয়েছে, যেখানে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা এবং ভোট পরবর্তী হিংসা নিত্যদিনের ঘটনা।
পাঁশকুড়ার মাটি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘ভয়ের আখ্যান’ শুরু করলেন, তা আসলে তাঁর রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাকেই প্রকট করে তুলল। উন্নয়নের বদলে যখন কোনো নেত্রী ‘খাদ্যাভ্যাস’ নিয়ে আশঙ্কার কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে তাঁর ঝুলিতে দেখানোর মতো সাফল্য আর বিশেষ কিছু নেই। এখন দেখার, বাংলার মানুষ এই ‘কাল্পনিক ভূত’ দেখে ভয় পায়, নাকি ব্যালট বক্সে তার যোগ্য জবাব দেয়।