প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, “লড়াই শুরু হওয়ার আগেই যদি সেনাপতি মাঠ ছাড়ে, তবে সেই দলের কপালে শুধুই লণ্ঠন জোটে!” ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের হাইভোল্টেজ পুনর্নির্বাচনের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে ঠিক এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারিরই জন্ম দিলেন রাজ্যের সদ্য-ঘোষিত প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত ‘ডাকসাইটে’ নেতা জাহাঙ্গির খান। কদিন আগেও যিনি ময়দানে বুক চিতিয়ে ‘খেলা হবে’ মার্কা তর্জন-গর্জন করছিলেন, ভোটের ঠিক আগের রাতে তিনিই ‘লেজ গুটিয়ে’ রণে ভঙ্গ দিলেন। রাজনৈতিক মহলের স্পষ্ট টিপ্পনী— “পুষ্পা” জাহাঙ্গির বাবু যে নতুন বিজেপি সরকারের দাপটে এভাবে ‘ঝুঁকে যাবেন’, তা বোধহয় খোদ ভাইপো খোকাবাবুও কল্পনা করতে পারেননি!
নবান্ন হাতছাড়া হওয়ার পর তৃণমূলের যে কী করুণ দশা হয়েছে, তা ফলতার এই ঘটনাতেই স্পষ্ট। এতদিন যে ফলতায় বিরোধীদের কোণঠাসা করে রাখাটাই তৃণমূলের দস্তুর ছিল, সেখানে হঠাৎ জাহাঙ্গির খানের মুখে ‘শান্তি ও উন্নয়নের’ বাণী শুনে হেসেই আকুল রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তিনি সাফ জানিয়েছেন, ফলতার শান্তির স্বার্থেই নাকি তিনি আর লড়ছেন না। তার চেয়েও বড় কৌতুক, রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতার জন্য যে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, তাকে তিনি দরাজ শংসাপত্র দিয়েছেন! ওয়াকিবহাল মহলের খোঁচা— ক্ষমতা যেতেই সুর বদলে গেল? যে শুভেন্দুর ভয়ে তৃণমূল কাঁপত, ভোটের মুখে তাঁরই উন্নয়ন নীতিতে বুঁদ হয়ে গেলেন জাহাঙ্গির বাবু! তবে কি এটা শুধুই শান্তির খোঁজ, নাকি নিশ্চিত পরাজয়ের গণধোলাই চাক্ষুষ করে এক চতুর ‘রাজনৈতিক ডিগবাজি’?
নেপথ্যের সমীকরণ ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, চামড়া বাঁচানোর এই নাটকের স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়েছিল আরও আগেই। এই ঘোষণার ঠিক আগের দিনই একটি মামলায় গ্রেফতারি এড়াতে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে বিশেষ আইনি রক্ষাকবচ জোগাড় করেছিলেন জাহাঙ্গির বাবু। আর আইনি পিঠ বাঁচতেই কেল্লাফতে! চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ‘বিপ্লবের ভূত’ মাথা থেকে নেমে গেল এবং তিনি বুঝলেন যে ক্ষমতার দাপট ছাড়া সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে বাড়িতে বসে ‘শান্তি’ উদযাপন করা অনেক বেশি নিরাপদ। যদিও আইনি নিয়মের কারণে ইভিএম-এ জোড়াফুল প্রতীক আর জাহাঙ্গির খানের নাম জ্বলজ্বল করবে। কিন্তু যে সেনাপতি নিজেই সাদা পতাকা উড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁর নাম মেশিনে থাকা আর না থাকা সমান!
তৃণমূল প্রার্থীর এই নজিরবিহীন পলায়নে রাজ্যে নতুন বিরোধী দলটির মুখ পুড়ে একেবারে কয়লা হয়ে গিয়েছে। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে তৃণমূলের বড় বাবুরা এখন টুইট করছেন, “এটা জাহাঙ্গিরের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, দলের এরম কোনো নির্দেশ ছিল না”। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পাল্টা প্রশ্ন— ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরেই প্রার্থীর এমন ‘ব্যক্তিগত বৈরাগ্য’ আসে কীভাবে? দল কি এতটাই ঠুঁটো জগন্নাথ যে নিজের প্রার্থীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই?বিজেপি শিবির অবশ্য এই সুযোগে তৃণমূলকে ধুয়ে দিয়েছে। গেরুয়া শিবিরের সাফ বক্তব্য, ফলতায় এবার পদ্ম ফোটানো আটকানোর ক্ষমতা তৃণমূলের ছিল না। রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর বুথে বুথে এজেন্ট দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাচ্ছিল না ঘাসফুল শিবির। ফলে ফলতায় নিশ্চিত ভরাডুবি এবং জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতেই ভোটের আগে জাহাঙ্গির বাবু এই ‘সেফ এক্সিট’ নিলেন। ২১ মে ফলতার মানুষ বুথে যাবেন ঠিকই, তবে নতুন বিরোধী দল তৃণমূলের এই ‘বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী’ ছেড়ে পালানোর ঘটনা বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে এক চরম লজ্জাজনক অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে।