প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
উত্তর ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মানচিত্রে আমডাঙা বিধানসভা কেন্দ্রটি বরাবরই খবরের শিরোনামে থাকে। তবে ২০২৬-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে সেখানে শাসক দল তৃণমূলের অন্দরে যা ঘটল, তা এককথায় নজিরবিহীন। যে দল দিনরাত ‘উন্নয়ন’ আর ‘একতা’র বুলি আওড়ায়, তাদের নিজেদের কঙ্কালসার চেহারাটা এবার প্রকাশ্য মঞ্চেই বেরিয়ে এল। বিদায়ী বিধায়ক রফিকুর রহমান যখন নিজের মেয়াদের উন্নয়নের খতিয়ান দিতে মঞ্চে উঠেছিলেন, তখনই তাঁর হাত থেকে রীতিমতো ‘ছিনিয়ে’ নেওয়া হলো মাইক। অভিযোগ উঠেছে বর্তমান প্রার্থী কাসেম সিদ্দিকীর অনুগামীদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় আমডাঙার তৃণমূলের কর্মিসভা।
গত ২৬শে মার্চ, আমডাঙায় দলের একটি সাংগঠনিক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তিনবারের জয়ী হেভিওয়েট বিদায়ী বিধায়ক রফিকুর রহমান। এবারের নির্বাচনে দল তাঁকে টিকিট না দিয়ে ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা কাসেম সিদ্দিকীকে প্রার্থী করেছে। এই ‘প্রার্থী বদল’ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই আমডাঙার ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে ক্ষোভের আগুন ধিকধিক করে জ্বলছিল। সভা চলাকালীন রফিকুর রহমান যখন মঞ্চে বক্তব্য রাখতে ওঠেন এবং নিজের ১০ বছরের কাজের খতিয়ান দিতে শুরু করেন, ঠিক তখনই তেড়ে আসেন কাসেম অনুগামীরা। অভিযোগ, প্রবীণ বিধায়কের বক্তব্য মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, মঞ্চের ওপরই বিধায়ককে ঘিরে ধরে ধাক্কাধাক্কি ও চরম হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে একদল কর্মীর বিরুদ্ধে।
আমডাঙার এই ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের ওপর নেতৃত্বের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। টিকিট না পেয়ে রফিকুর রহমানের অনুগামীরা আগেই আমডাঙা-কাঁকিনাড়া রোড অবরোধ করে এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, ‘ভূমিপুত্র’ রফিকুর রহমানকেই ফের প্রার্থী করতে হবে। কিন্তু দল অনড় থাকায় সেই ক্ষোভ এবার সরাসরি মঞ্চে আছড়ে পড়ল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রফিকুর রহমানের মতো বর্ষীয়ান নেতাকে যেভাবে নিজ দলের মঞ্চে লাঞ্ছিত হতে হলো, তা আমডাঙার সাধারণ ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে।
তৃণমূলের এই ‘গৃহযুদ্ধ’ এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। আমডাঙার সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যে দলের কর্মীরা নিজেদের বিধায়ককেই মঞ্চে কথা বলার ন্যূনতম সম্মান দিতে জানে না, তারা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কীভাবে? প্রকাশ্য সভায় একজন বিধায়ককে হেনস্থা করার ঘটনা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, আমডাঙায় তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি কতটা আলগা হয়ে গিয়েছে। এই বিশৃঙ্খলার ভিডিও ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে শুরু করেছে, যা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না বিরোধী শিবির।
আমডাঙা কেন্দ্রের একটা বড় অংশ সংখ্যালঘু ভোট। কাসেম সিদ্দিকীকে প্রার্থী করে তৃণমূল সেই ভোটব্যাঙ্ক নিশ্চিত করতে চাইলেও, রফিকুর রহমানের অনুগামীদের এই বিদ্রোহ দলের অস্বস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আমডাঙার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় এই ধরনের প্রকাশ্য কোন্দল বিজেপি-র ভোট শতাংশ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। সাধারণ ভোটারদের একাংশের বক্তব্য, “তৃণমূলের জামানায় উন্নয়ন যে কেবল সভার মাইকেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ হাতেকলমে প্রমাণিত।”
আমডাঙার এই রাজনৈতিক ‘আগ্নেয়গিরি’ শেষ পর্যন্ত ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার। তবে বিদায়ী বিধায়কের এই অপমান তৃণমূলের জন্য যে বড় কোনো বিপর্যয় ডেকে আনবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।