প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
রাজনীতির ময়দান যদি হয় দাবার বোর্ড, তবে আজকের চালটা দিলেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। আজ হলদিয়ার শান্ত আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলো এক প্রলয়ঙ্কারি হুঙ্কারে— “লড়াইয়ের ময়দানে দেখা হবে, তৃণমূলের বিসর্জন এবার নিশ্চিত!” মহকুমা শাসকের দপ্তরে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়ার আগে কদমতলার ‘বিজয় সংকল্প সভা’ থেকে শাসকের কফিনে শেষ পেরেকটি যেন পুঁতে দিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে এদিন হলদিয়া সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উন্মাদনার।
এদিন সকাল থেকেই হলদিয়ার কদমতলা এলাকা গেরুয়া আবিরে ছেয়ে গিয়েছিল। যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষের মাথা আর আকাশছোঁয়া স্লোগান। শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থনে আয়োজিত এই পদযাত্রা যখন শুরু হয়, তখন মনে হচ্ছিল হলদিয়ার রাজপথে যেন এক গেরুয়া সুনামি আছড়ে পড়েছে। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের উন্মাদনা দেখে রাজনৈতিক মহলের স্পষ্ট দাবি— হলদিয়া আজ বুঝিয়ে দিল, এই মাটি এখনও কার দখলে! মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগে এই অভাবনীয় শক্তি প্রদর্শন আসলে শাসক শিবিরের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য এক সুপরিকল্পিত মাস্টারস্ট্রোক।
মঞ্চে উঠেই চেনা মেজাজে ‘রুদ্রমূর্তি’ ধারণ করেন শুভেন্দু। আক্রমণের ধার কয়েক গুণ বাড়িয়ে তিনি বলেন, “বাংলার মানুষ আজ দুর্নীতির জালে হাঁপিয়ে উঠেছে। চোর-জোচ্চোরদের দিন ঘনিয়ে এসেছে। আপনারা তৈরি তো? লড়াইয়ের ময়দানেই এবার বুঝে নেব কার কত দম!” সরাসরি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন, এই সরকার সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে নিজেদের পকেট ভরেছে। বালি চুরি, কয়লা পাচার আর গরিবের হকের চাকরি বিক্রির টাকায় যারা প্রাসাদ বানিয়েছে, তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে বলে তীব্র হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শুভেন্দুর সাফ কথা, “রাজ্যের মানুষ জেগে গেছে, আর ভয় দেখিয়ে বাংলার কণ্ঠরোধ করা যাবে না।”
শুভেন্দু এদিন শুধু আক্রমণেই থেমে থাকেননি, রীতিমত অংকের হিসেবে জয়ের ভবিষ্যৎবাণী করেছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সুরে ঘোষণা করেন, “তৃণমূলের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। লিড নিয়ে কোনো সংশয় রাখবেন না। প্রতিটি বুথে বিজেপি গড়ে অন্তত ৫০০ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। এবার আর ছাপ্পা মেরে বা পুলিশ দিয়ে ভয় দেখিয়ে পার পাওয়া যাবে না। কেন্দ্রীয় বাহিনী আর আমাদের বুথ স্তরের দুর্জয় কর্মীদের সম্মিলিত প্রতিরোধে ধুয়ে মুছে যাবে সবুজ বাহিনী।” তাঁর এই চাঞ্চল্যকর দাবি উপস্থিত কয়েক হাজার কর্মীর মধ্যে এক নতুন বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
বিরোধীদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপ হেনে শুভেন্দু বলেন, “হলদিয়ার মানুষ বেইমানি সহ্য করে না, আর যারা বাংলার সম্মান মাটির দরে বিক্রি করেছে, তাদের ক্ষমা করার প্রশ্নই ওঠে না।” অত্যন্ত কৌশলী ভাষায় তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রশাসনিক মদতে যারা দাদাগিরি করছে, তাদের হিসেব এবার কড়ায়-গন্ডায় চুকিয়ে দেওয়া হবে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, এবারের লড়াই কোনো বিশেষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং দুর্নীতির এক সামগ্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রাক্কালে শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘বিজয় সংকল্প সভা’ আসলে বঙ্গ রাজনীতির এক নতুন মোড়। এটি শুধু একটি নির্বাচনী সভা ছিল না, এটি ছিল শাসকের দুর্ভেদ্য দুর্গে সজোরে আঘাত হানার এক রণধ্বনি। শুভেন্দুর চোখেমুখে ছিল জয়ের চওড়া হাসি আর তৃণমূলের জন্য এক অমোঘ সতর্কবার্তা। হলদিয়ার ধুলো উড়িয়ে তাঁর এই মেজাজি আক্রমণ বুঝিয়ে দিচ্ছে, এবার মেদিনীপুরের লড়াইটা হবে আক্ষরিক অর্থেই ‘কাঁটে কা টক্কর’। আজকের এই সভা থেকে যে আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়েছে, তা ইভিএমে কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটাই দেখার। তবে শুভেন্দুর ‘৫০০ লিড’-এর লক্ষ্য পূরণ হলে নবান্ন দখলের রাস্তা যে অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।