প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-গণতন্ত্রের উৎসবে কি তবে শাসানির ছায়া? আইন-আদালতকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জেল থেকে বেরিয়েই ফের স্বমহিমায় অবতীর্ণ হলেন শাসকদলের এক দাপুটে নেতা। গ্রেফতার হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যক্তিগত বন্ডে মুক্তি পেতেই তাঁর গলায় শোনা গেল সেই পুরনো হুঙ্কার। জামিন পেয়েই সরাসরি দিলেন এক রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর হুঁশিয়ারি। ‘যা হওয়ার ২৩ তারিখের পরেই হবে’— নেতার মুখে এই এক লাইনের রক্তচক্ষু শাসানিতে এখন রীতিমতো আতঙ্কে কাঁপছে গোটা মুর্শিদাবাদ। ভোট আবহে বাংলার গণতন্ত্রের এই কঙ্কালসার রূপ দেখে কার্যত স্তম্ভিত রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।

ঘটনার সূত্রপাত মুর্শিদাবাদের বহরমপুর পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানকার তৃণমূল ব্লক সভাপতি রাজু মণ্ডলের একটি ভিডিও সম্প্রতি ঝড়ের গতিতে সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নেতা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্যত নিদান দিচ্ছেন। তাঁর সাফ কথা ছিল— ভোট দিতে হলে তৃণমূলকেই দিতে হবে, অন্যথায় ভোট দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু তাই নয়, ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখতে তিনি দাবি করেন, “কে কাকে ভোট দিচ্ছে সব দেখার জন্য ক্যামেরা থাকবে এবং সব লাইভ হবে।” এমনকি ‘পদ্মফুলে’ ভোট দিলে ফল যে ভালো হবে না, সেই মর্মে প্রচ্ছন্ন হুমকিও শোনা যায় তাঁর গলায়।ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসে ভারতের নির্বাচন কমিশন। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনের কড়া নির্দেশে পুলিশ সক্রিয় হতে বাধ্য হয়। এরপরই রাজু মণ্ডলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য এবং এলাকা দখলের মানসিকতা থেকেই এই ধরনের দাদাগিরি চালাচ্ছিলেন ওই তৃণমূল নেতা।

গ্রেফতারির পর মনে করা হয়েছিল আইনের জালে হয়তো কিছুটা সংযত হবেন অভিযুক্ত নেতা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ধরা দিল সম্পূর্ণ উল্টোভাবে। নাটকীয়ভাবে মাত্র একদিনের মধ্যেই ব্যক্তিগত বন্ডে জেল থেকে মুক্তি পান তিনি। আর কারাগারের লোহার শিকল থেকে মুক্তি পেতেই ফের চেনা মেজাজে ধরা দিলেন রাজু মণ্ডল। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা তাঁর দিকে ঘুরতেই কোনো অনুশোচনা ছাড়াই তিনি সাফ জানান, “যা হওয়ার ২৩ তারিখের পরেই হবে।” কী লুকিয়ে আছে ২৩ তারিখের আড়ালে? এই একটি বাক্য ঘিরেই এখন দানা বাঁধছে হাজারো বিতর্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ২৩ তারিখের পর কি সাধারণ ভোটার বা বিরোধীদের ওপর কোনো বড়সড় ‘অ্যাকশন’ নেওয়া হবে? এটি কি শুধুই কোনো রাজনৈতিক স্লোগান, নাকি নির্বাচনের পর বিরোধীদের ওপর প্রত্যাঘাতের আগাম বার্তা? এই রহস্যময় ও আক্রমণাত্মক মেজাজ ঘিরে এখন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

বিজেপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছে, “তৃণমূলের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছে। তাই এখন পুলিশ-প্রশাসন এবং গুন্ডাবাহিনীর শাসানিকেই শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। কিন্তু মানুষ আর ভয় পাবে না।” বিরোধীদের দাবি, জামিন পেয়েই এই ধরনের হুমকি দেওয়া আসলে আদালতের রায়কেও অসম্মান করার শামিল।

এখন দেখার, জেল থেকে বেরিয়ে এই প্রকাশ্য হুমকির পর নির্বাচন কমিশন এবং জেলা প্রশাসন ওই নেতার বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয় কি না। বাংলার ভোটের ময়দানে কি তবে শেষমেশ হুমকির সংস্কৃতিই দাপিয়ে বেড়াবে? উত্তর মিলবে সময় এলেই।