প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভোটের মুখে ফের অস্বস্তিতে রাজ্যের শাসক দল। দক্ষিণ কলকাতার বহুমূল্য জমি দখল ও বেআইনি কারবার সংক্রান্ত তদন্তে আজ, শুক্রবার সাতসকালেই ফের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট (ED)-এর তলবে হাজিরা দিলেন রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক দেবাশিস কুমার। আজ বেলা ১২টা নাগাদ সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দপ্তরে তাঁকে ঢুকতে দেখা যায়। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের মুখোমুখি হলেন তিনি, যা ঘিরে কলকাতার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

ইডির তদন্তকারী আধিকারিকদের সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ ও রাসবিহারী সংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু সরকারি ও মালিকানাধীন জমি বেআইনিভাবে দখল করে প্রোমোটিং করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তির একটি প্রভাবশালী চক্র ও কলকাতার এক নামজাদা বেসরকারি নির্মাণ সংস্থার দিকে। অভিযোগ উঠেছে, কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ থাকাকালীন দেবাশিস কুমারের দপ্তরের কিছু নথিপত্রে কারচুপি করে এই জমিগুলির চরিত্র বদল করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়ো মালিক সাজিয়ে কোটি কোটি টাকার জমি হাতবদল করার প্রমাণও ইডির হাতে এসেছে বলে খবর। এই চক্রের শিকড় কতদূর এবং এর বিনিময়ে কোনো প্রভাবশালী নেতার কাছে কত টাকা পৌঁছেছে, তা জানতেই মরিয়া কেন্দ্রীয় সংস্থা।

উল্লেখ্য, গত ৩০ মার্চ সোমবার প্রথমবার সিজিও কমপ্লেক্সে তলব করা হয়েছিল দেবাশিস কুমারকে। সেদিন প্রায় কয়েক ঘণ্টা তাঁকে জেরা করা হয়। সূত্রের খবর, প্রথম দিনের জেরায় দেবাশিসবাবুর দেওয়া বেশ কিছু বয়ানের সঙ্গে ইডির হাতে থাকা নথিপত্রের বড়সড় অসঙ্গতি মিলেছে। বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি বলে জানা গিয়েছে। সেই ‘মিসিং লিঙ্ক’ বা যোগসূত্র খুঁজতেই আজ তাঁকে ফের নথিপত্রসহ তলব করা হয়েছে। আজ সিজিও কমপ্লেক্সে ঢোকার সময় তাঁর শরীরি ভাষায় ক্লান্তির ছাপ থাকলেও, সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে তিনি মুখ খোলেননি।

নির্বাচনের ঠিক মুখে খোদ প্রার্থীর এভাবে বারবার কেন্দ্রীয় সংস্থার দপ্তরে হাজিরা দেওয়া রাসবিহারী কেন্দ্রে তৃণমূলের ভাবমূর্তিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের নেতৃত্বের দাবি, “তৃণমূল মানেই দুর্নীতি আর সিন্ডিকেট। বালিগঞ্জ থেকে রাসবিহারী— সর্বত্রই জমি মাফিয়াদের দাপট। সাধারণ মানুষের জমি যারা লুঠ করেছে, তাদের জায়গা জেলের ভেতরেই হওয়া উচিত। ইডি নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে বলেই আজ রাঘববোয়ালদের ঘুম উড়ে গিয়েছে।” পাল্টা তৃণমূলের পক্ষ থেকে যথারীতি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ ধুয়া তোলা হলেও, আমজনতার মধ্যে এই জমি জালিয়াতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাসবিহারীর মতো শিক্ষিতাভিজাত কেন্দ্রে দুর্নীতির এই ছায়া তৃণমূলের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে যেখানে জমি দখলের মতো স্পর্শকাতর বিষয় জড়িয়ে রয়েছে, সেখানে ভোটারদের মনে বড়সড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। দেবাশিস কুমারের মত অভিজ্ঞ নেতাকে কেন বারবার সিজিও-র বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি চায়ের দোকানে।

আজকের ম্যারাথন জেরা শেষে ইডি আধিকারিকরা তাঁর উত্তরে সন্তুষ্ট হন কি না, নাকি আরও কঠোর কোনো পদক্ষেপের দিকে হাঁটেন, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য। তবে ভোটের এই ভর মৌসুমে রাসবিহারীর তৃণমূল প্রার্থীর এই সিজিও যাত্রা যে বিরোধী শিবিরে বাড়তি অক্সিজেন জুগিয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তদন্তের জাল যেভাবে গুটিয়ে আসছে, তাতে আগামী দিনে আরও বড় কোনো তথ্য সামনে আসে কি না, এখন সেটাই দেখার।