প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজ্যের বহুল চর্চিত এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর কয়লা পাচার মামলার (Coal Smuggling Case) তদন্তে এক অভাবনীয় মোড়। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং টানাপড়েনের পর অবশেষে বড়সড় জয় পেল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। কলকাতা হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে স্বস্তিতে ফিরলেন এই মামলার অন্যতম প্রধান তদন্তকারী অফিসার উমেশ কুমার ও তাঁর গোটা টিম। সোমবার আদালতের এই নির্দেশের পর রাজ্য রাজনীতিতে যেমন তোলপাড় শুরু হয়েছে, তেমনই অস্বস্তিতে পড়েছে অভিযোগকারী পক্ষ।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে। কয়লা পাচার কাণ্ডের শিকড় খুঁজতে যখন সিবিআই-এর দুঁদে অফিসার উমেশ কুমার তদন্তের জাল বিস্তার করছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ উঠতে শুরু করে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা এবং তৃণমূল কর্মী হিসেবে পরিচিত জনৈক হাইবার আখান দাবি করেন, তদন্তের নামে তাঁকে ভয় দেখানো হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ ছিল, সিবিআই অফিসাররা তাঁকে মানসিক চাপ দিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে বয়ান দেওয়ার জন্য বাধ্য করছেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ২০২২ সালের মে মাসে বিষ্ণুপুর থানায় সিবিআই অফিসারদের বিরুদ্ধে আইপিসির ১৩ টি গুরুতর ধারায় মামলা রুজু হয়। রাজ্য পুলিশ এবং পরবর্তীকালে সিআইডি (CID) এই মামলার তদন্তভার হাতে নেয়। কেন্দ্রীয় সংস্থার অফিসারদের বিরুদ্ধে রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থার এই সক্রিয়তা নিয়ে সেই সময় থেকেই রাজ্য বনাম কেন্দ্রের সংঘাত তুঙ্গে উঠেছিল।
দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে এই মামলার শুনানি চলে কলকাতা হাই কোর্টে। সিবিআই-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তদন্তের গতি রুদ্ধ করতেই সুপরিকল্পিতভাবে অফিসারদের বিরুদ্ধে এই ধরণের ‘ভিত্তিহীন’ অভিযোগ আনা হয়েছে। সোমবার বিচারপতি উদয় কুমারের সিঙ্গল বেঞ্চ এই যুক্তিতেই সিলমোহর দেয়। আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানান, সিবিআই অফিসারদের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগের কোনও জোরালো সারবত্তা বা প্রমাণ মেলেনি। বরং তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং অফিসারদের ওপর পাল্টা মানসিক চাপ তৈরি করতেই এই এফআইআর (FIR) করা হয়েছিল বলে মনে করছে আদালত। ফলস্বরূপ, উমেশ কুমারসহ অন্যান্য সিবিআই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিআইডি-র করা সেই এফআইআর পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারপতি।
রাজনৈতিক ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় সিবিআই-এর জন্য এক বিরাট নৈতিক জয়। উমেশ কুমার কয়লা পাচার মামলার তদন্তের অন্যতম স্তম্ভ। তাঁর ওপর থেকে আইনি খাড়া সরে যাওয়ায় এখন তদন্তকারী দল আরও দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করতে পারবে। বিশেষ করে অনুপ মাজি ওরফে লালা এবং তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে যে বিশাল সিন্ডিকেট চলত, সেই চক্রের মূল পান্ডাদের ধরতে এখন আর কোনও আইনি বাধা রইল না।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণাত্মক মেজাজে দেখা যাচ্ছে বিজেপি শিবিরকে। তাদের দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ভয় দেখিয়ে রোখা যাবে না, তা আজ প্রমাণিত। অন্যদিকে, অভিযোগকারী তৃণমূল কর্মীর পক্ষ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই রায়ের ফলে কয়লা পাচার মামলার দৃশ্যপট আমূল বদলে যেতে পারে। এখন দেখার, আদালতের এই রক্ষাকবচ পাওয়ার পর কয়লা পাচার কাণ্ডের ‘রাঘববোয়াল’দের জালে তুলতে সিবিআই কতটা আগ্রাসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।