প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি হারানোর পরও পুরোনো অভ্যাস কি সহজে যায়? রাজ্য পুলিশ তাঁর নিরাপত্তারক্ষী বদল করতেই কালীঘাটে শুরু হয়ে গেল বিরোধী শিবিরের হাই-ভোল্টেজ ড্রামা। বিজেপি সরকারের প্রশাসনিক ও আইনি নিয়মে পাঠানো নতুন নিরাপত্তারক্ষীদের ফিরিয়ে দিয়ে, এখন বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে ঘর করছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই রুটিন বদলিকেই ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে মাঝরাতে ডেরেক ও’ব্রায়েনকে দিয়ে ভিডিও শুট করিয়ে সস্তা পলিটিক্যাল মাইলেজ পাওয়ার খেলায় নেমেছে তৃণমূল নেতৃত্ব, এমনটাই দাবি রাজনৈতিক মহলের। কিন্তু আবেগ আর নাটক বাদ দিয়ে যদি প্রশাসনিক যুক্তি ও তথ্যের নিরিখে বিচার করা যায়, তবে আসল সত্যটা ঠিক কী?
প্রথম তথ্য হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জেড প্লাস’ (Z+) ক্যাটাগরির নিরাপত্তা কিন্তু এক চুলও প্রত্যাহার করা হয়নি। তাঁর বাড়ির চারপাশের নিরাপত্তা বলয়, পাইলট কার বা এসকর্ট গাড়ি—সব আগের মতোই রয়েছে। পুলিশ কেবল তাঁর ৩ জন পার্সোনাল সিকিউরিটি অফিসার (PSO)-কে নিয়ম মেনে পরিবর্তন করেছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তির স্থায়ী সম্পত্তি হতে পারে না। তাহলে নতুন রক্ষীদের ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে অরক্ষিত দাবি করার নেপথ্যে কি শুধুই প্রচারের আলো পাওয়ার চেষ্টা? সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক যুক্তিটি এখানেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন অতীতে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন আরপিএফ (RPF) এবং রেলের কিছু কর্মীকে নিজের পিএসও হিসেবে পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর, ওই কর্মীরা রাজ্য পুলিশে ডেপুটেশনে চলে আসেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে একই অফিসারদের নিজের পছন্দের বলয়ে রেখে দেওয়া হয়েছিল। ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, কোনো সরকারি কর্মচারীকে কি এভাবে বছরের পর বছর রোটেশন ছাড়া একজনের সেবায় রেখে দেওয়া যায়? রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার এসে কেবল সেই দীর্ঘদিনের চেনা বৃত্তের অবসান ঘটিয়েছে এবং ওই কর্মীদের তাঁদের মূল পেরেন্ট ইউনিটে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ অফিসারদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর বদলি (Rotation) করতে হয়। বছরের পর বছর একই জায়গায় ডিউটি করলে নিরাপত্তার কড়া নজরদারিতে ঢিলেমি আসার আশঙ্কা থাকে। নবান্ন ও পুলিশ প্রশাসন সেই সরকারি প্রোটোকল মেনেই ডিউটি রোস্টার পরিবর্তন করেছে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীদের দাবি—তাঁকে না জিজ্ঞেস করে কেন অফিসার বদলানো হলো?স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, দেশের প্রশাসনিক ডিরেক্টরি কি এখন কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশিকা মেনে চলবে?
তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন মাঝরাতে ভিডিও পোস্ট করে দাবি করলেন, নেত্রীর বাড়ির সামনের কিয়স্ক খালি! অথচ বিজেপি শিবিরের পাল্টা দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সরকারি রক্ষীদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজেই রক্ষী তাড়িয়ে, আবার নিজেই সুরক্ষার অভাব নিয়ে সরব হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ট্রোল শুরু হয়েছে। উপরন্তু, ডেরেক নিজের গাড়ি দিয়ে গেট আটকে পাহারা দেওয়ার যে ছবি দেখালেন, তা দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—এটি আন্তর্জাতিক মানের সুরক্ষা ব্যবস্থা নাকি শুধুই ক্যামেরার সামনে রাজনৈতিক প্রদর্শন?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে রাখতে হবে যে তিনি এখন একজন সাধারণ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মাত্র। আইন ও নিয়ম সবার জন্য সমান। নিজের বিশ্বস্ত লোকেদের দিয়ে ঘেরা টোপে থাকার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের অধীনে নিয়মের শাসনে তা বদলাতে বাধ্য। সরকারি নিয়মকে উপেক্ষা করে নতুন পুলিশকর্মীদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা মোতায়েন করা আসলে রাজ্যের নিয়মতান্ত্রিক পুলিশ বাহিনীর প্রতি এক ধরণের অনাস্থা প্রকাশ, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।