প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভোটের মরসুমে বাংলার রাজনৈতিক পারদ এমনিতেই তুঙ্গে। তার ওপর নদীয়ার নির্বাচনী সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য যেন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বয়ানকে হাতিয়ার করে তিনি যে দাবি করেছেন, তাতে রাজনৈতিক মহলে রীতিমত চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর সরাসরি নিশানায় এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু কেন হঠাৎ ‘পহেলগাঁও’ বা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর প্রসঙ্গ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী? এর নেপথ্যে কি কোনো সুগভীর রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করছে?

এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক চাঞ্চল্যকর দাবি করে বসেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে কোনো সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে তাঁরা সরাসরি কলকাতাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ শানাবেন। মুখ্যমন্ত্রীর মূল আক্রমণের জায়গাটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “পাকিস্তানের মন্ত্রী যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীকে এমন সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী গত রবিবার কোচবিহারের সভায় এসে এ বিষয়ে কোনো কড়া বার্তা দিলেন না কেন? কেন তিনি বললেন না যে কলকাতাকে টার্গেট করা হচ্ছে?” মমতার এই প্রশ্ন সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সদিচ্ছাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

সবচেয়ে বিতর্কিত এবং রহস্যময় বিষয়টি হলো মমতার মুখে ‘পহেলগাঁও’-এর উল্লেখ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জনসভা থেকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “আরও একটা পহেলগাঁওয়ের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়ে গিয়েছে?” এই একটি বাক্যেই রাজ্য রাজনীতিতে প্রশ্নের পাহাড় দাঁড়িয়ে গেছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে এক ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীও ছিলেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, কোনো নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ বা ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করার উদ্দেশ্য কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ‘অনিরাপত্তার বোধ’ তৈরি করে আবেগপ্রবণ ভোট আদায় করার এটি একটি সুচতুর কৌশল হতে পারে।

বিজেপি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মমতার এই আক্রমণকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, পাকিস্তানের কোনো মন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যের দায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপানো এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করাকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’ হিসেবে দেখছেন। যেখানে ভারতের বিদেশমন্ত্রক আন্তর্জাতিক স্তরে এই ধরণের হুমকির যোগ্য জবাব দিতে সদাপ্রস্তুত, সেখানে নির্বাচনী সভায় একে টেনে আনা আসলে মূল উন্নয়নের ইস্যু বা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মানুষের নজর ঘোরানোর চেষ্টা বলেই মনে করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী কি এমন কোনো বিশেষ গোয়েন্দা তথ্য জানেন যা দেশের সরকার জানে না? নাকি স্রেফ অনুমানের ভিত্তিতে এমন সংবেদনশীল কথা বলছেন? এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যদি তাঁর কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে, তবে তা উপযুক্ত দফতরে না জানিয়ে জনসভায় বলা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে বিতর্ক দানা বাঁধছে। আর যদি তা কেবলই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হয়, তবে এ ধরণের আতঙ্ক ছড়ানো জনমানসে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে কাটাছেঁড়া।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘পহেলগাঁও আতঙ্ক’ কি সত্যিই মানুষের মনে দাগ কাটবে, নাকি বুমেরাং হয়ে তাঁর দিকেই ফিরে আসবে? প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করতে গিয়ে কি তিনি অজান্তেই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা করলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে সচেতন নাগরিক সমাজ। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, এই একটি ভাষণ আগামী কয়েকদিন বাংলার ভোটের লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।