প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-তপ্ত রোদে উত্তপ্ত উত্তরবঙ্গ। কিন্তু সেই উত্তাপকে ছাপিয়ে গেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গলার স্বর। রবিবার কোচবিহারের ঐতিহাসিক রাসমেলা ময়দান সাক্ষী থাকল এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সমাবেশের। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে। তবে সবথেকে বেশি চর্চা হচ্ছে তাঁর দেওয়া একটি বিশেষ স্লোগান নিয়ে, যা কার্যত তৃণমূলের ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সভার শুরুতেই চেনা মেজাজে ধরা দেন মোদী। উত্তরবঙ্গের মানুষের আবেগকে ছুঁয়ে তিনি সাফ জানান, বাংলার মানুষ গত এক দশকে যা সহ্য করেছেন, তার অবসান আসন্ন। জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।” স্থানীয় ভাষায় এই ‘পাল্টানো’ বা উল্টে দেওয়ার ডাক কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং শাসকদলের প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন বলে দাবি বিজেপির। রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী এই একটি লাইনেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ২০২৬-এ বিজেপি কোনো আপস করতে রাজি নয়।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রমণের মূলে রয়েছে তৃণমূল সরকারের একাধিক ব্যর্থতা। মোদী তাঁর ভাষণে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, পশ্চিমবঙ্গ আজ ‘দুর্নীতির জননী’তে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি—তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের নাম জড়ানোয় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তাকেই হাতিয়ার করেছেন। তাঁর দাবি, রাজ্যের উন্নয়নের চাকা থমকে গিয়েছে সিন্ডিকেট রাজের চক্করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী গতকাল কোচবিহারকে বেছে নিয়েছেন অত্যন্ত কৌশলগতভাবে। উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। সেখান থেকেই তিনি বার্তা দিয়েছেন যে, দক্ষিণবঙ্গের জন্য ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ উত্তর থেকেই বইতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় বারবার উঠে এসেছে “৪ মে” তারিখটির কথা। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দুর্নীতিবাজদের জন্য জেলের দরজা খোলা থাকবে এবং জনগণের লুঠ হওয়া টাকা কড়ায়-গন্ডায় ফেরত দেওয়া হবে।
সন্দেশখালি থেকে শুরু করে মালদহ—রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে মোদী এদিন ছিলেন রণংদেহী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে রাজ্যে খোদ বিচারকরা নিরাপদ নন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? তৃণমূলের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ রাজনীতির কারণে অনুপ্রবেশকারীরা সুরক্ষা পাচ্ছে এবং ভূমিপুত্ররা কোণঠাসা হচ্ছে— প্রধানমন্ত্রীর এই বিস্ফোরক অভিযোগ কার্যত তৃণমূলের ‘জাতীয়তাবাদী’ ইমেজে বড়সড় ধাক্কা।
মোদীর রবিবাসরীয় এই সভা কেবল একটি নির্বাচনী জনসভা ছিল না, বরং তা ছিল তৃণমূলের একাধিপত্যের অবসান ঘটানোর একটি ব্লু-প্রিন্ট। রাসমেলা ময়দানের ভিড় এবং প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা বুঝিয়ে দিচ্ছে, ২০২৬-এর লড়াই হতে চলেছে অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। এখন দেখার, প্রধানমন্ত্রীর এই ‘পাল্টানো’র ডাক বাংলার ভোটবাক্সে কতটা প্রভাব ফেলে।