প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-মেদিনীপুরের লাল মাটিতে দাঁড়িয়ে ফের একবার রাজনৈতিক পারদ সপ্তমে চড়ালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান—যা পশ্চিম মেদিনীপুরের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে দশকের পর দশক ধরে এক দুঃস্বপ্ন আর ফি-বছর বন্যার নোনা জলের দীর্ঘশ্বাসের নাম, সেই সংবেদনশীল ইস্যুতেই এবার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নজিরবিহীন ভাষায় আক্রমণ শানালেন তিনি। ডেবরার বিশাল জনসভা থেকে শাহের গর্জন, “প্রধানমন্ত্রী মোদীজি ১৫০০ কোটি টাকার ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান উন্নয়নের জন্য পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তৃণমূল সরকার তাকে কার্যত জঞ্জালে পরিণত করেছে!”

বেশ কিছুদিন আগেই সিঙ্গুর থেকে ধুমধাম করে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলে ঘোষণা করেছিলেন, “কেন্দ্র টাকা দিচ্ছে না, তাই রাজ্য সরকার নিজের গাঁটের কড়চা করেই (প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা) এই প্রকল্প করবে।” মুখ্যমন্ত্রীর সেই প্রচারের বেলুন এদিন সপাটে ফুটো করে দিয়েছেন অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্য দিয়ে দাবি করেন, এই মেগা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ অর্থ অর্থাৎ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা সরাসরি দিল্লি থেকে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল মোদী সরকারের। শাহের অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আর রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কারণেই সেই টাকা মানুষের কাজে লাগেনি। শাহের চাঁচাছোলা আক্রমণ—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সদিচ্ছার অভাবেই আজ কয়েক প্রজন্ম ধরে ঘাটালের মানুষ বর্ষা এলেই ঘরবাড়ি হারান এবং বন্যার জলে হাবুডুবু খান। শাহ এদিন স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রের সদিচ্ছা থাকলেও রাজ্যের অনীহাই ছিল এই প্রকল্পের প্রধান অন্তরায়।

ঘাটাল, দাসপুর, চন্দ্রকোণা থেকে শুরু করে কেশপুর—বর্ষা এলেই এই বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটান। তাঁদের সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত যন্ত্রণাকে ছুঁয়ে এদিন এক অভাবনীয় ‘গ্যারান্টি’ দিয়েছেন অমিত শাহ। তিনি সরাসরি মেদিনীপুরবাসীর চোখের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “তৃণমূল ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে রাজনীতি করে একে আস্তাকুঁড়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনারা আর চিন্তা করবেন না। বাংলায় একবার বিজেপির সরকার নিয়ে আসুন, আমি কথা দিচ্ছি মাত্র এক বছরের মধ্যে এই মাস্টার প্ল্যান পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করে নিকাশি ব্যবস্থার চিরস্থায়ী সমাধান করে দেব।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মেদিনীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে শাহের এই ‘৩৬৫ দিনের ডেডলাইন’ এক বিরাট গেম-চেঞ্জার হতে চলেছে। যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘রাজ্যের টাকায় কাজ’ করার কার্ড খেলেছেন, সেখানে শাহ সরাসরি কেন্দ্রের ১৫০০ কোটির বরাদ্দ এবং তৃণমূলের ‘অসহযোগিতা’র খতিয়ান জনসমক্ষে এনে শাসকদলকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছেন।

অমিত শাহ এদিন বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মেদিনীপুরের মানুষের আবেগ নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। শাহের এই হুঙ্কার কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং রাজ্যের শাসকদলের উন্নয়নের দাবিকে সরাসরি বড়সড় চ্যালেঞ্জ জানানো। মেদিনীপুরের এই কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ে শাহের এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ এখন তোলপাড় ফেলে দিয়েছে গোটা রাজ্য রাজনীতিতে। সাধারণ মানুষও এখন হিসাব কষতে শুরু করেছেন—আসলেই কি দীর্ঘদিনের এই অভিশপ্ত বন্যা সমস্যার সমাধান হতে আর মাত্র এক বছরের অপেক্ষা?

শাহের এই বক্তব্যের পর তৃণমূলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া কী হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল। তবে আজকের জনসভার ভিড় আর শাহের আত্মবিশ্বাসী মেজাজ জানান দিচ্ছে, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এবার ভোটের ময়দানে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে চলেছে।