প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২১ র নির্বাচনের আগে স্লোগান উঠেছিল ‘দুয়ারে সরকার’। কিন্তু ২৬ এর বিধানসভা ভোটের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হতেই পূর্বস্থলী উত্তরের তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে দিলো, বর্তমানে ঘাসফুল শিবিরের নীতি আসলে ‘দুয়ারে বহিরাগত’। দীর্ঘদিনের লড়াকু কর্মীদের ব্রাত্য করে সিপিএম এবং বিজেপি থেকে আসা “সুবিধাবাদী” নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ায় এবার কার্যত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটল শাসক দলের অন্দরে। পূর্বস্থলী উত্তরের তিনবারের বিধায়ক তথা এলাকার জনপ্রিয় মুখ তপন চট্টোপাধ্যায় এবার বিধানসভার টিকিট না পেয়ে দলত্যাগ না করলেও, রাজনীতির আঙিনা থেকে চিরতরে বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়েছে চরম অভিমান ও ঘৃণা। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, “১৯৯৮ সালে দল প্রতিষ্ঠার সময় থেকে যাঁরা রক্ত জল করে লড়াই করেছেন, তাঁদের আজ কোনো মর্যাদা নেই। বরং সিপিএম আর বিজেপি থেকে আসা নেতারাই এখন সবচেয়ে বড় সম্পদ।”

আর এই মন্তব্যই তৃণমূলের সেই ‘কঙ্কাল’টিকে জনসমক্ষে বের করে এনেছে, যা ঢাকা দিতে এতদিন ব্যস্ত ছিলো ক্যামাক স্ট্রিট ও কালীঘাট। বর্ষীয়ান এই বিধায়ককে শুধু টিকিট থেকেই বঞ্চিত করা হয়নি, প্রার্থী তালিকায় বদল আনার পাশাপাশি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে তাঁর নিরাপত্তা। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, “প্রাক্তন বিধায়ক হয়ে গেছি বলেই নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হয়েছে। টিকিট না দিয়ে আসলে দল আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, এবার সম্মানের সাথে অবসর নেব।”

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তপন চট্টোপাধ্যায়ের এই বিদ্রোহ পূর্বস্থলী উত্তর কেন্দ্রে তৃণমূলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে দেখা যায়, ২০২১ সালের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তপনবাবু ভালো ব্যবধানে জিতলেও, লোকসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছে তৃণমূলের ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে বিজেপির নিরন্তর কাজ এবং তৃণমূলের আদি-নব্য দ্বন্দ্বের সুযোগে গেরুয়া শিবিরের ভোট শতাংশ প্রায় ৭-৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তপনবাবুর অনুগামীরা যদি ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে যান, তবে সেই ভোট সরাসরি বিজেপির ঝুলিতে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সাধারণ মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত নব্য তৃণমূল নেতাদের চেয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির লড়াকু নেতাদের ওপর বেশি ভরসা করেন। এই ঘটনায় তীব্র কটাক্ষ করেছে বিজেপি নেতৃত্ব। তাদের মতে, “তৃণমূল এখন একটি কোম্পানি, যেখানে পুরনো কর্মীদের কোনো জায়গা নেই। যারা সিপিএম-এর হার্মাদ ছিল, তারাই এখন তৃণমূলের সম্পদ। তপনবাবুর মত মানুষেরা দেরিতে হলেও সত্যিটা বুঝতে পেরেছেন। মানুষ এবার ব্যালটে এর জবাব দেবে।”

এদিকে তৃণমূলের অন্দরের এই বিদ্রোহ শুধু পূর্বস্থলী উত্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। টিকিট বণ্টন নিয়ে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে শাসকদলকে খড়কুটোর মত উড়িয়ে দিতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার— দিদির কাছে এখন ‘আদি’ কর্মীরা জঞ্জাল, আর ‘পদ্ম-কাস্তে’ থেকে আসা নেতারাই আসল তুরুপের তাস। দিনের শেষে তেমনটাই বলছেন রাজনৈতিক সমালোচকরা।