প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট- রাজ্য রাজনীতিতে এখন টানটান উত্তেজনা। বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনিক রাশ আলগা হতে শুরু করেছে তৃণমূল শিবিরের। শুক্রবার দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুরের নির্বাচনী জনসভা থেকে সেই অস্বস্তিই যেন প্রকট হয়ে ধরা দিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে একের পর এক প্রশাসনিক রদবদল নিয়ে এদিন রীতিমত খড়্গহস্ত হলেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘদিনের ‘তল্পিবাহক’ আধিকারিকদের হাতছাড়া হওয়াতেই কি এবার মেজাজ হারিয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারির পথে হাঁটলেন মুখ্যমন্ত্রী?
এদিন হরিরামপুরের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, কমিশন গায়ের জোরে পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের (ডিজি, সিপি, ডিএম) সরিয়ে দিয়েছে। তাঁর কথায়, “সব পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমার হাত থেকে সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে কিছুদিনের জন্য।” তবে এই ‘অসহায়ত্ব’ প্রকাশের মাঝেই প্রচ্ছন্ন হুমকির সুর শোনা গিয়েছে তাঁর গলায়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “আবার আসব। তারপর বিচার হবে।” প্রশ্ন উঠছে, একজন সাংবিধানিক পদে আসীন ব্যক্তি হয়ে নির্বাচন চলাকালীন কর্তব্যরত আধিকারিকদের ‘ভবিষ্যৎ বিচারের’ ভয় দেখানো কি প্রকারান্তরে তাঁদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা? বিরোধীদের দাবি, পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই এখন আধিকারিকদের শাসানি দিয়ে নিজের দিকে টানতে চাইছেন তৃণমূল নেত্রী।
মালদহের মোথাবাড়ির সাম্প্রতিক অশান্তি ও তার তদন্ত নিয়ে এদিন বিস্ফোরক দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এনআইএ-র প্রবেশের আগেই রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইডি (CID) মিম নেতা মোফাক্কেরুল ইসলামকে গ্রেফতার করায় তিনি কার্যত পিঠ চাপড়েছেন নিজের প্রশাসনের। মমতা মনে করিয়ে দিয়েছেন, “সিআইডি কমিশনের হাতে নেই, আমার হাতে আছে।” ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, যেখানে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে গোটা প্রশাসন কমিশনের অধীনে থাকা উচিত, সেখানে একটি বিশেষ সংস্থাকে ‘নিজের কব্জায়’ বলে দাবি করা কি নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবেশকে কালিমালিপ্ত করে না? পদ্ম শিবিরের পাল্টা তোপ, কেন্দ্রীয় সংস্থাকে রুখতেই সিআইডি-কে হাতিয়ার করছে রাজ্য সরকার।ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে কি ধস আড়াল করার চেষ্টা?
এদিন মুখ্যমন্ত্রীর নিশানায় ছিল এক বিচিত্র রাজনৈতিক সমীকরণ। তাঁর অভিযোগ, হায়দরাবাদ বা মুম্বই থেকে মিম নেতাদের ‘ভাড়া’ করে এনে অশান্তি ছড়াচ্ছে বিজেপি। এমনকি এই ষড়যন্ত্রে তিনি আইএসএফ ও কংগ্রেসকেও একাসনে বসিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে বড়সড় ধস নামার আশঙ্কা থেকেই এখন চারিদিকে ‘ষড়যন্ত্রের ভূত’ দেখছেন মমতা। যে দলগুলো একসময় তাঁর উন্নয়নের সহযোগী হতে চেয়েছিল, ভোটের অংকে আজ তারাই মুখ্যমন্ত্রীর চোখে ‘বিজেপির গেম প্ল্যান’।
সব মিলিয়ে, হরিরামপুরের সভা থেকে মমতার এদিনের বক্তব্য আসলে এক গভীর রাজনৈতিক বিড়ম্বনারই প্রতিফলন। একদিকে প্রশাসনিক রদবদল নিয়ে ক্ষোভ, অন্যদিকে সিআইডি-কে নিয়ে দর্প—এই বৈপরীত্যই বলে দিচ্ছে যে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে লড়াইটা তৃণমূলের জন্য কতটা কঠিন। এখন দেখার, ‘ভবিষ্যৎ বিচারের’ এই হুমকি ভোটবাক্সে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, নাকি মানুষ পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দেয়।