প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জ—যে মাটি গত বছর ভিজেছিল বাবা আর ছেলের রক্তে, সেই মাটিই আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে শমসেরগঞ্জের আকাশে-বাতাসে এখন আর শুধু ভোটের স্লোগান নেই, মিশে আছে এক চাপা হাহাকার আর বিচারের তীব্র দাবি। এদিন রাজপথে বিজেপির এক সম্মেলনে যা ঘটল, তা কার্যত গোটা বাংলার রাজনীতিতে ভূমিকম্প এনে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের এপ্রিলে। ওয়াকফ সংশোধনী বিল বিরোধী আন্দোলনের নামে এক নারকীয় তাণ্ডব দেখেছিল শমসেরগঞ্জের জাফরাবাদ। অভিযোগ উঠেছিল, প্রকাশ্য দিবালোকে ঘর থেকে টেনে বের করে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর পুত্র চন্দন দাসকে। সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আজও শিউরে ওঠে মুর্শিদাবাদ। যদিও আদালত ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে, কিন্তু নিহতের পরিবারের দাবি— “আসল রাঘববোয়ালরা আজও অধরা।” রাজ্য সরকারের দেওয়া ক্ষতিপূরণ ফিরিয়ে দিয়ে সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড় থাকা সেই পরিবারই আজ সরাসরি বিজেপির মঞ্চে।
ধুলিয়ানে বিজেপি প্রার্থী ষষ্ঠী চরণ ঘোষের সমর্থনে আয়োজিত মঞ্চে যখন দেখা গেল হরগোবিন্দ দাসের স্ত্রী পারুল দাস এবং পুত্রবধূ পিঙ্কি দাস, তখন মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায় গোটা সভা। দুই মহিলার চোখের জল যেন শাসকদলের তথাকথিত ‘উন্নয়নের’ কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁদের সেই কান্নায় ভেঙে পড়া আর হাতজোড় করে বিচার চাওয়া—এই দৃশ্য এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল একটি প্রচার নয়, এটি শাসক শিবিরের দুর্ভেদ্য গড়ে এক বিশাল ফাটল।
শমসেরগঞ্জের সাধারণ মানুষের মনে ওই হত্যাকাণ্ডের ক্ষত আজও দগদগে। নিহতের পরিবারকে সরাসরি বিজেপির মঞ্চে দেখে সাধারণ ভোটারের মনে এক বিশাল আবেগ কাজ করবে, যা ব্যালট বক্সে প্রতিফলিত হতে বাধ্য। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো ভয় আর নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। বিজেপি এই ইস্যুকে সামনে রেখে ‘জঙ্গলরাজ’ তকমা দিয়ে শাসকদলকে কোণঠাসা করার অস্ত্র পেয়ে গেল। আদালত সাজা দিলেও পরিবারটি এখনও সন্তুষ্ট নয়। তাঁদের এই ‘অসন্তোষ’ সাধারণ মানুষের মনে শাসকদলের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিজেপি নেতৃত্ব অত্যন্ত সুকৌশলে এই পরিবারটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী শুরু থেকেই এই পরিবারের পাশে ছিলেন। আজ যখন সেই পরিবারটি নিজের মুখে তাঁদের যন্ত্রণার কথা বলছেন, তখন তাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া শাসকদলের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শমসেরগঞ্জের মাটি এখন আর কেবল ভোটের ময়দান নয়, এটি এখন ‘ন্যায়বিচারের’ প্রতীক্ষা। নিহতের পরিবারের এই গর্জন কি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে শমসেরগঞ্জের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবে? উত্তর সময়ের গর্ভে, কিন্তু শমসেরগঞ্জের হাওয়া যে আজ থেকে বদলে গেল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।