প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলো বীরভূমের রাজনৈতিক মাটি। অনুব্রত মণ্ডলের (কেষ্ট) কারামুক্তির পর যেখানে শাসক শিবিরের ঘর গোছানোর কথা ছিল, সেখানে শুক্রবার মুরারইয়ে খোদ সাংসদ শতাব্দী রায়ের উপস্থিতিতে যা ঘটল, তা দেখে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। মুরারই ১ নম্বর ব্লকের দলীয় কার্যালয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি সভা চলাকালীন যা দৃশ্য দেখা গেল, তা নজিরবিহীন।

শুক্রবার মুরারই ১ নম্বর ব্লক তৃণমূল কার্যালয়ে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে এক বিশেষ সাংগঠনিক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন এলাকার দীর্ঘদিনের সাংসদ শতাব্দী রায় এবং মুরারইয়ের বিধায়ক মোশারফ হোসেন। সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই উত্তপ্ত হতে শুরু করে পরিবেশ। স্থানীয় তৃণমূল নেতা আলি খান আচমকাই ডুরিয়া অঞ্চলের তিন পঞ্চায়েত সদস্যার স্বামীদের বিরুদ্ধে দলবিরোধী কাজের অভিযোগ তোলেন এবং তাঁদের অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবি জানান। এই দাবি ঘিরেই ব্লক সভাপতি বিনয় ঘোষের অনুগামীদের সঙ্গে আলি খানের অনুগামীদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, শতাব্দী রায়ের চোখের সামনেই এই বাদানুবাদ হাতাহাতি এবং একে অপরকে লক্ষ্য করে তেড়ে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়েন সাংসদ। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, নিজের দলের কর্মীদের শান্ত করতে ব্যর্থ হয়ে চরম বিরক্তির সঙ্গে সভা ত্যাগ করে বেরিয়ে যান শতাব্দী রায়।

রাজনৈতিক মহলের মতে, বীরভূমে এখন তৃণমূলের অন্দরে এক অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই চলছে। একদিকে অনুব্রত মণ্ডলের পুরনো লড়াকু বাহিনী, অন্যদিকে জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। মুরারইয়ের এই ঘটনা আসলে নিচুতলার কর্মীদের আধিপত্য রক্ষার লড়াই। ব্লক সভাপতি বিনয় ঘোষ এবং বিধায়ক মোশারফ হোসেনের অনুগামীদের মধ্যেকার এই বিভাজন দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, বিধায়ক দলীয় কার্যালয়ের বাইরে আলি খানের বাড়িতে একটি আলাদা ‘সমান্তরাল’ নির্বাচনী অফিস চালাচ্ছেন, যা ব্লক সভাপতির গোষ্ঠী মেনে নিতে পারছে না। এই ঠান্ডা লড়াই এদিন শতাব্দীর উপস্থিতিতেই বিস্ফোরক আকার নিল।

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সরব হয়েছে বিজেপি। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, “তৃণমূলের অন্দরে এখন আর কোনো শৃঙ্খলা নেই। ভাগ-বাঁটোয়ারা আর ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে এরা নিজেদের মধ্যেই লড়াই করছে। বীরভূমের মানুষ এই বিশৃঙ্খলা দেখে বিরক্ত এবং তারা পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে”

তৃণমূলের অন্দরে এত কোন্দল থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদের জয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু মজবুত কারণ। রাজনৈতিক মারপিট যাই হোক না কেন, গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘বিনামূল্যে রেশন’-এর মতো প্রকল্পগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়। সুবিধাভোগী ভোটাররা সাধারণত ভোটের সময় এই বিষয়গুলিকেই গুরুত্ব দেন। বীরভূমে বিজেপি শক্তিশালী হলেও, সেখানে বাম ও কংগ্রেসের একটা নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক আছে। বিরোধী ভোট যত বেশি বিভক্ত হবে, তৃণমূলের জেতার রাস্তা তত পরিষ্কার হবে। যদি বিজেপি বিরোধী ভোট এককাট্টা করতে না পারে, তবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সুবিধা পাবে শাসক দলই। অনুব্রত মণ্ডল বীরভূমের সংগঠনের নাড়ি-নক্ষত্র জানেন। নির্বাচনের আগে তিনি যদি কঠোর হাতে এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামাল দিতে পারেন এবং কর্মীদের এক সূত্রে বাঁধতে পারেন, তবে ফল তৃণমূলের অনুকূলেই যাবে। মুরারই, নলহাটি বা পাইকরের মত এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশই তৃণমূলের দিকে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকলেও নির্বাচনের সময় ‘সাম্প্রদায়িক শক্তির’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে এই ভোট এক ছাতার তলায় আনতে তৃণমূল সিদ্ধহস্ত।

মুরারইয়ের এই ঘটনা শতাব্দীর জন্য অস্বস্তিকর হলেও, তৃণমূল একে একটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবেই দেখছে। তবে দলীয় স্তরে যদি এই ফাটল এখনই মেরামত করা না যায়, তবে ভোটের বাক্সে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। আপাতত মুরারইয়ের এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল, যা নিয়ে সরগরম গোটা বীরভূম।