প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের অঙ্ক যেমন জটিল, তেমনই জটিল ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার খেলা। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভরাডুবির পর ঘাসফুল শিবির এখন রাজ্যের বিরোধী বেঞ্চে। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলেও তৃণমূলের অন্দরের ‘গৃহযুদ্ধ’ থামার লক্ষণ নেই। সম্প্রতি বিধানসভায় দলের হুইপ উড়িয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করার পরেই বীরভূমের পাঁচ তৃণমূল বিধায়কের নিরাপত্তা এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দিয়েছে নতুন রাজ্য সরকার—এমনটাই দাবি রাজনৈতিক মহলের একাংশের। কাজল শেখ, চন্দ্রনাথ সিনহা, রাজেন্দ্রপ্রসাদ সিং, মোশারফ হোসেন এবং বিধানচন্দ্র মাঝি—এই পাঁচ বিধায়কের চারপাশে এখন রাতারাতি বসে গেছে কড়া পুলিশি পাহারা। প্রশ্ন হলো, ভোটের আগে যাদের দাপটে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত, আজ বিরোধী আসনে বসার পর হঠাৎ তাঁদের কিসের এত ভয়? নাকি এই ‘নিরাপত্তা’র আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সমীকরণ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা—এই নিরাপত্তা বৃদ্ধি আসলে কোনো সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ। কদিন আগেই ক্ষমতা হারানোর পর এই নেতাদের ঘাড় থেকে অতিরিক্ত পুলিশি নিরাপত্তা এবং পার্সোনাল সিকিউরিটি গার্ড (PSG) একঝটকায় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে খবর। তাহলে আজ হঠাৎ কী এমন ঘটল যে নতুন সরকার তাঁদের জন্য পুলিশ পাঠাতে ব্যাকুল হয়ে উঠল? সূত্রের খবর, তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন যখন নিজেদের “আসল তৃণমূল” দাবি করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তখন খোদ কালীঘাটের সুপ্রিমোর পায়ের তলার মাটি সরে গেছে। এই পাঁচ বিধায়ক যেহেতু সেই ‘বিদ্রোহী’ বা ভিন্নমতাবলম্বী শিবিরের প্রথম সারিতে আছেন, তাই নতুন সরকার তাঁদের এই ‘সাহসিকতা’র পুরস্কার হিসেবেই নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিল কি না, সেই প্রশ্ন কিন্তু উঠছে রাজনৈতিক অলিন্দে।
এ যেন এক অদ্ভুত রাজনৈতিক প্রহসন! একদিকে তৃণমূলের অফিশিয়াল নেতৃত্ব যখন নিজেদের ঘর সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন শাসকদল খুব চতুরতার সঙ্গে তৃণমূলের অন্দরের ফাটলকে আরও চওড়া করতে চাইছে বলে দাবি বিরোধীদের। বীরভূমের এই পাঁচ বিধায়ককে বাড়তি নিরাপত্তা দিয়ে নতুন সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চাইল? এটা কি সত্যিই তাঁদের সুরক্ষা, নাকি অন্য কোনো চাল? কে কার সাথে দেখা করছেন, কার গোপন বৈঠক কার সাথে হচ্ছে—তার প্রতি মুহূর্তের খতিয়ান ডায়েরিতে তোলার জন্য কি এই বিশেষ পুলিশি ঘেরাটোপ? রাজনৈতিক মহলের একাংশ বলছেন, একেই বলে ‘এক ডিলে দুই পাখি মারা’। একদিকে বিদ্রোহী বিধায়কদের আশ্বস্ত করা যে তারা সুরক্ষিত, অন্যদিকে তাঁদের ওপর সুকৌশলে নজরদারি কায়েম রাখা। ক্ষমতা হারিয়ে তৃণমূলের ঘর আজ যেভাবে ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে, তাকে ত্বরান্বিত করতে নবান্নের এই নয়া চাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার চাবিকাঠি যার হাতেই থাক, পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি বানিয়ে খেলা চিরকাল বুমেরাং হয়েছে। বীরভূমের এই পাঁচ বিধায়কের ‘নিরাপত্তা নাটক’ শেষ পর্যন্ত বাংলায় কোন নতুন রাজনৈতিক অঙ্কের জন্ম দেয়, সেটাই এখন দেখার।