প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে চিরশত্রু বা চিরমিত্র বলে কিছু হয় না— এই আপ্তবাক্যটি আরও একবার প্রমাণ করলেন আসানসোলের তৃণমূল সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহা। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটানা দীর্ঘ ১২ বছর দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকার যে ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছেন, তাকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সোশাল মিডিয়ায় কুর্নিশ জানালেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা-রাজনীতিক। টুইটে শত্রুঘ্ন বাবু লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২ বছর পূর্ণ করায় আন্তরিক অভিনন্দন। আপনার সুস্থ, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘজীবন কামনা করি।’ বিরোধী শিবিরের একজন হেভিওয়েট সাংসদের মুখ থেকে এমন অকপট শুভেচ্ছা বার্তা শুনে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে এখন জল্পনার পারদ তুঙ্গে।
যে নরেন্দ্র মোদির নীতির বিরুদ্ধে একসময় কড়া সমালোচনা করতে ছাড়তেন না শত্রুঘ্ন, আজ মোদিজিই ওনার টুইটে দেশের ‘বন্ধু এবং পথপ্রদর্শক’ (Friend & Guide)! তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কোনো রাজনৈতিক তিক্ততা নয়, বরং এক প্রকৃত ‘স্পোর্টসম্যান স্পিরিট’ বা খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা নিয়েই তিনি এই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ভালোই বোঝেন, ক্ষমতার অলিন্দে এই ধরনের ‘স্পিরিট’ আসলে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ। দিল্লি থেকে কলকাতা— সর্বত্র এখন একটা খবর ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণমূলের ১৯ জন অসন্তুষ্ট সাংসদের একটি তালিকায় শত্রুঘ্ন সিনহার নামও চর্চায় রয়েছে, যারা নাকি স্পিকারের কাছে দরবার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও সূত্র বলছে, তিনি এখনও কোনো চিঠিতে স্বাক্ষর করেননি, তবুও এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর এই পোস্টটি কি কেবলই সৌজন্য, নাকি কোনো ভবিষ্যৎ সমীকরণের আগাম বার্তা— তা নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই!
আইনি বা রাজনৈতিক কোনো ঝুঁকি না নিয়ে শত্রুঘ্ন বাবু কায়দা করে তাঁর পোস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং যশবন্ত সিনহার মতো বিরোধী নেতাদেরও ট্যাগ করেছেন। নিজেকে ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘সৌজন্যের প্রতীক’ হিসেবে দেখানোর এই চেষ্টা বেশ চতুর হলেও, রাজনীতির চাণক্যরা এর ভেতরের অন্য অর্থ খুঁজছেন।
সময়ের চাকা ঘুরতে বেশি সময় লাগে না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। রাজ্যে এখন আর তৃণমূল ক্ষমতায় নেই। নবান্নের কুর্সি এখন বিজেপির দখলে এবং মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের রাশ শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূল এখন কেবলই এক ক্ষয়িষ্ণু বিরোধী শক্তি। রাজ্যে ক্ষমতার দণ্ড এখন সম্পূর্ণ বিজেপির হাতে। এই পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে আসানসোলের সাংসদ খুব ভালো করেই বোঝেন, দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদি আর রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর ডবল ইঞ্জিন সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী রাজনীতি করা কতটা কঠিন। তাই কি আগেভাগেই দিল্লির মন জয়ের এই চেষ্টা?
যদিও যাবতীয় জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে পরবর্তীতে শত্রুঘ্ন সিনহা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কঠিন সময়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেন না এবং তিনি তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে প্রকাশ্যে যা বলা হয়, আড়ালে তার উল্টো স্রোত বইবার ইতিহাস নতুন নয়। বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে এবং পরবর্তীতে তৃণমূলে আসা শত্রুঘ্ন সিনহার এই ‘মোদি-বন্দনা’ কেবলই একটা সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা, নাকি খুব শীঘ্রই ওনার পুরোনো ঘরে (বিজেপি) ফেরার রাজকীয় ট্রেলার— সেটাই এখন দেখার।