প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-আইপ্যাক (I-PAC) কাণ্ডে রাজ্যের রাজনৈতিক ও আইনি অলিন্দে তোলপাড় ফেলা মামলার শুনানি আজ শেষ হলো দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর অফিসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর তল্লাশিতে বাধা দেওয়া এবং নথি গায়েব করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আজ সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ সওয়াল-জবাব চলে। বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি এন ভি আঞ্জারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চ সমস্ত পক্ষের বক্তব্য শোনার পর এই মামলার রায়দান স্থগিত (Judgment Reserved) রেখেছেন। এই মামলায় একদিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল, অন্যদিকে ইডি-র পক্ষে লড়াই করেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) এস ভি রাজু।
আজ আদালতে ইডির তরফ থেকে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আনা হয়। ইডির আইনজীবী এস ভি রাজু আদালতে দাবি করেন, কয়লা কেলেঙ্কারির বেআইনি অর্থ লেনদেনের তদন্তে কলকাতার আইপ্যাক অফিসে যখন কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকরা তল্লাশি চালাচ্ছিলেন, তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সেখানে সশরীরে পৌঁছে যান এবং তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেন। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এনে ইডি জানায়, তল্লাশি অভিযান চলাকালীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এবং নথি নিজের সাথে তুলে নিয়ে যান, যা তদন্তের তথ্যপ্রমাণ নষ্ট ও প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার শামিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই রাজ্য পুলিশের প্রভাব এড়াতে সরাসরি সিবিআই (CBI) তদন্তের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।
শুনানি চলাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে এক নজিরবিহীন ও কৌশলগত সওয়াল পেশ করেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করে জানান, রাজ্যে এখন সরকার পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে এবং শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। সিব্বল আদালতে বলেন, “যখন এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি আর মুখ্যমন্ত্রী পদে নেই। তাই তদন্তের ক্ষেত্রে কোনও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর আইনি বাধা বা প্রতিবন্ধকতা অবশিষ্ট নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান রাজ্য সরকারের কাছে ‘দিল্লি স্পেশাল পুলিশ এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৪৬’ অনুযায়ী যেকোনো মামলার তদন্তভার সরাসরি সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়ার পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টের আলাদা করে নির্দেশ দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই, রাজ্য সরকার চাইলে নিজেরাই এই মামলার সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে এবং এতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষের কোনও আপত্তি থাকবে না।
কপিল সিব্বলের এই সওয়ালের পালটা জবাবে ইডির আইনজীবী এস ভি রাজু জানান, রাজ্য সরকার যদি নিজে থেকে সিবিআই-কে কেসটি হস্তান্তর করে, তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ‘অসদুপায়’ (Mala fide) পদক্ষেপের অভিযোগ উঠতে পারে। তা ছাড়া, এই মামলায় শুধু প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীই নন, তৎকালীন রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (DGP) রাজীব কুমার এবং কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মনোজ কুমার বর্মা সহ একাধিক কর্মরত পদস্থ পুলিশ আধিকারিকও অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন, যাঁরা তদন্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন। তাই কেন্দ্রীয় সংস্থার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আদালতের নির্দেশেই তদন্ত হওয়া উচিত। উভয়পক্ষের এই দীর্ঘ ও তীব্র বাদানুবাদ শোনার পর সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, মামলাটি সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হবে নাকি নতুন রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে, সেই সীমিত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে। আপাতত সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী রায়ের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের রাজনৈতিক মহল।