প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ক্ষমতার অলিন্দ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের আরাম-আয়েস নয়, বিপদের দিনে প্রশাসন যে আক্ষরিক অর্থেই সাধারণ মানুষের পাশে থাকে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হলো কলকাতায়। তারাতলার ব্রেস ব্রিজের কাছে নির্মাণাধীন পাঁচতলা গোডাউনের ছাদ ধসে পড়ার ভয়াবহ বিপর্যয়ে রাতভর উদ্ধারকাজ চালাল রাজ্য সরকার। বুধবার দুপুর থেকে শুরু করে সারারাত ধরে চলা এই মেগা অভিযানে যেভাবে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব ও মন্ত্রীরা সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে মাটি কামড়ে পড়ে রইলেন, তা এক নজিরবিহীন মানবিক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

বুধবার দুপুরে যখন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মাণাধীন গোডাউনটির ছাদের বিশাল অংশ, মুহূর্তের মধ্যে ধুলো আর কান্নার রোলে ভারী হয়ে ওঠে তারাতলার আকাশ। খবরের গুরুত্ব বুঝে সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচী বাতিল করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এবং মন্ত্রী ড. ইন্দ্রনীল খাঁ। রাতের অন্ধকারে যখন গ্যাস কাটার আর ভারী ক্রেন দিয়ে কংক্রিটের স্ল্যাব সরানোর কাজ চলছিল, তখন ধুলো-বালির তোয়াক্কা না করে সারারাত স্পটেই দাঁড়িয়ে রইলেন এই দুই মন্ত্রী। উদ্ধারকারী দলগুলির মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ সামাল দিয়ে উদ্ধারকাজকে মসৃণ রাখতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূমিকা নেন তাঁরা।

অন্যদিকে, ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তাক্ত শ্রমিকদের যখন একে একে গ্রিন করিডোর করে এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানেও তৈরি ছিল সরকারি তৎপরতা। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জি ও স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ নিগম গভীর রাত পর্যন্ত এসএসকেএম-এর ট্রমা কেয়ার সেন্টারে ঘাঁটি গেড়ে বসেন। আহতদের জরুরি অস্ত্রোপচার, বেডের ব্যবস্থা এবং ওষুধপত্রের জোগান যাতে এক সেকেন্ডের জন্যও ব্যাহত না হয়, তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মন্ত্রীর এই মানবিক উপস্থিতি শুধু যে চিকিৎসকদের বাড়তি উদ্যমে কাজ করতে সাহায্য করেছে তাই নয়, হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষারত জখমদের অসহায় পরিবারগুলির চোখেও এক বিরাট ভরসা জুগিয়েছে।

পুরো উদ্ধার অভিযানের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং। তিনি নিজে একদিকে যেমন দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে আহত ও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান, তেমনই অন্যদিকে উদ্ধারকাজের গতি বাড়াতে ভারতীয় সেনাবাহিনী (Army), NDRF এবং দমকল বাহিনীকে যৌথ মেগা অপারেশনে নামান। মানুষের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি রুখতে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপও নিয়েছেন। পূর্বতন সরকারের আমলে অনুমোদিত সমস্ত নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক প্রকল্পের কাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রেখে সেগুলির স্ক্রুটিনি ও সেফটি অডিটের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

উদ্ধারকাজ এবং মানবিকতার পাশাপাশি রাজধর্ম পালনেও পিছপা হয়নি সরকার। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ স্পষ্ট জানিয়েছেন, “এর পেছনে যত বড় রাজনৈতিক নামই থাক, তদন্ত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।” ইতিমধ্যেই পুলিশের তরফে সুপারভাইজার সহ ঘটনার সাথে যুক্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে দাঁড়িয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে তাঁর ক্যাবিনেটের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এই রাতভর অতন্দ্র দায়িত্বপালন প্রমাণ করে দিল—বর্তমান সরকার আক্ষরিক অর্থেই জনগণের, জনগণের সুরক্ষায় সদা জাগ্রত।